বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাব শুধু জনস্বাস্থ্যের জন্যই নয়, হাজারো পরিবারের আর্থিক অবস্থার ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা, ওষুধ, যাতায়াত এবং হাসপাতালে দীর্ঘ সময় অবস্থানের কারণে অনেক পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।

এমনকি অসুস্থ সন্তানের পাশে থাকতে গিয়ে কেউ কেউ চাকরিও হারিয়েছেন। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি) এবং বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সাম্প্রতিক এক জরিপে এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

সোমবার প্রকাশিত ওই জরিপে দেশের অন্তত ১২টি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে যাওয়া ২ হাজার ৭৪৬টি পরিবারের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত পরিবারের বড় একটি অংশ চিকিৎসা ব্যয় সামাল দিতে আর্থিক সংকটে পড়েছে। অনেক পরিবারকে ধারদেনা করতে হয়েছে, আবার অনেকে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতেও হিমশিম খাচ্ছেন।

আইএফআরসির ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান আলবার্তো বোকানেগ্রা বলেন, হামের প্রভাব শুধু হাসপাতালের দরজায় শেষ হয় না। এই রোগের কারণে পরিবারগুলো দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপের মুখে পড়ে। তাঁর ভাষায়, জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি মানবিক সহায়তা এবং শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৮৪৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে এক লাখ ১২ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা-সংক্রান্ত ব্যয়ও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জরিপে আরও দেখা গেছে, ৩৫ শতাংশ পরিবারকে ওষুধ কেনার জন্য অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হয়েছে, আর ২২ শতাংশ পরিবারের খাবার সহায়তা প্রয়োজন হয়েছে। যদিও সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে, তবুও ওষুধ, যাতায়াত, খাবার এবং হাসপাতালে থাকা–সংক্রান্ত অন্যান্য খরচ অনেক পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর অধিকাংশই নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির। তারা মূলত অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন এবং তাদের মাসিক আয় ৪৮ থেকে ১৬০ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ।

অথচ হামে আক্রান্ত একজন শিশুর চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট খাতে গড়ে ১৩০ ডলারের বেশি ব্যয় করতে হয়েছে, যা অনেক পরিবারের এক মাসের আয়ের সমান বা তারও বেশি।

জরিপে অংশ নেওয়া হাজেরা খাতুন জানান, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও অন্যান্য খরচ বহন করা অত্যন্ত কঠিন। তিনি বলেন, শুধু অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার জন্যই প্রায় ২০০ ডলার ব্যয় করতে হয়েছে। অনেক অভিভাবক জানিয়েছেন, সন্তানের চিকিৎসার জন্য দিনের পর দিন হাসপাতালে থাকতে হওয়ায় তারা কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত চাকরি হারিয়েছেন।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মহাসচিব কবির এম আশরাফ আলম বলেন, জরিপে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে যে অনেক পরিবার শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিতেই নয়, চরম আর্থিক চাপের মধ্যেও রয়েছে। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি আর্থিক ও মানবিক সহায়তা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রোগটির নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই; তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

বিশেষ করে এমআর (মিজলস-রুবেলা) টিকা সময়মতো গ্রহণ করলে হামের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, শিশুদের নির্ধারিত সময়েই টিকা নিশ্চিত করতে এবং জ্বর, শরীরে লালচে দানা, কাশি বা চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!