গরমের দিনে অনেক পরিবারেই একটি সাধারণ দৃশ্য দেখা যায়। একই ঘরে একই পরিবেশে বসে থাকা দুইজন মানুষের মধ্যে একজন স্বাভাবিক অনুভব করলেও অন্যজন বারবার পাখার গতি বাড়াতে বা এসি চালাতে বলছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি গরম অনুভব করছেন। এটি শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির বিষয় নয় এর পেছনে রয়েছে শরীরের গঠন, হরমোন, বিপাকক্রিয়া এবং তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মতো একাধিক বৈজ্ঞানিক কারণ। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, একজন নারীর শরীর যেভাবে তাপ উৎপাদন ও তাপ নিয়ন্ত্রণ করে, তা পুরুষের শরীরের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন। তাই একই পরিবেশেও একজন নারীর কাছে গরম বেশি মনে হতে পারে।
তবে সব নারীই যে একইভাবে গরম অনুভব করবেন, এমন নয়। বয়স, ওজন, শারীরিক অবস্থা, গর্ভাবস্থা, ঋতুচক্র, মানসিক চাপ, খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন কারণও এতে ভূমিকা রাখে। তাই বিষয়টিকে কুসংস্কার বা অতিরঞ্জন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়ার অংশ। এই প্রতিবেদনে জানানো হলো, কেন অনেক নারীর বেশি গরম লাগে, কখন এটি স্বাভাবিক এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
হরমোনের পরিবর্তন শরীরের তাপমাত্রাকে প্রভাবিত করে
নারীদের শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন নামের দুটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন নিয়মিত ওঠানামা করে। বিশেষ করে ঋতুচক্রের বিভিন্ন সময়ে এই হরমোনের মাত্রা পরিবর্তিত হওয়ায় শরীরের তাপমাত্রাও সামান্য ওঠানামা করতে পারে। ডিম্বস্ফোটনের পর সাধারণত শরীরের মূল তাপমাত্রা কিছুটা বেড়ে যায়। ফলে অনেক নারী এই সময় অন্য সময়ের তুলনায় বেশি গরম অনুভব করেন। একইভাবে গর্ভাবস্থায় শরীরে রক্তপ্রবাহ ও বিপাকক্রিয়া বেড়ে যাওয়ার কারণে শরীর বেশি তাপ উৎপাদন করে। আবার মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে গেলে অনেকের ক্ষেত্রে হট ফ্ল্যাশ বা হঠাৎ শরীর গরম হয়ে যাওয়ার অনুভূতি দেখা দেয়। এটি কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে এবং কখনো কখনো অতিরিক্ত ঘামও হতে পারে।
শরীরের গঠন ও বিপাকক্রিয়ার পার্থক্যও একটি কারণ
নারী ও পুরুষের শরীরের গঠনে স্বাভাবিকভাবেই কিছু পার্থক্য রয়েছে। সাধারণভাবে নারীদের শরীরে চর্বির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি এবং পেশির পরিমাণ কম থাকে। পেশি বেশি থাকলে শরীর তাপ উৎপাদন ও তাপ নিয়ন্ত্রণের ধরন কিছুটা ভিন্ন হয়। অন্যদিকে শরীরে চর্বির স্তর তাপ ধরে রাখতে সাহায্য করে। ফলে অনেক সময় শরীরের ভেতরে তাপ আটকে থাকার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি বিপাকক্রিয়ার হার ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হলেও হরমোনের প্রভাবে নারীদের শরীরে তাপ নিয়ন্ত্রণের ধরণ পরিবর্তিত হতে পারে। এসব কারণ মিলিয়েই অনেক নারী একই আবহাওয়ায় অন্যদের তুলনায় বেশি অস্বস্তি অনুভব করেন।
ঋতুচক্রের বিভিন্ন ধাপে গরম বেশি লাগতে পারে
অনেক নারী লক্ষ্য করেন, মাসের নির্দিষ্ট সময়ে তাদের শরীরে গরমের অনুভূতি বেড়ে যায়। এটি সাধারণত ঋতুচক্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। ডিম্বস্ফোটনের পর প্রোজেস্টেরন হরমোনের প্রভাবে শরীরের তাপমাত্রা সামান্য বাড়ে। যদিও এই পরিবর্তন খুব বেশি নয়, তবু সংবেদনশীল ব্যক্তিদের কাছে এটি স্পষ্টভাবে অনুভূত হতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে এই সময়ে অতিরিক্ত ঘাম, ক্লান্তি বা অস্বস্তিও দেখা দেয়। তাই মাসের নির্দিষ্ট সময়ে গরম বেশি লাগা অনেক ক্ষেত্রেই শরীরের স্বাভাবিক হরমোনজনিত পরিবর্তনের অংশ।
গর্ভাবস্থা ও মেনোপজের সময় কেন গরম বাড়ে
গর্ভাবস্থায় শরীরের ভেতরে নতুন প্রাণের বিকাশের জন্য রক্তপ্রবাহ, হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্রম এবং বিপাকক্রিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এর ফলে শরীর স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপ উৎপাদন করে। একই সঙ্গে হরমোনের পরিবর্তনের কারণেও অনেক গর্ভবতী নারী সব সময় গরম অনুভব করেন। অন্যদিকে মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় মস্তিষ্কের তাপ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র কিছুটা সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। ফলে হঠাৎ শরীর গরম হয়ে যাওয়া, মুখ লাল হয়ে ওঠা এবং অতিরিক্ত ঘাম হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে হট ফ্ল্যাশ বলা হয়, যা মেনোপজের সবচেয়ে পরিচিত উপসর্গগুলোর একটি।
মানসিক চাপ ও উদ্বেগও গরম লাগার অনুভূতি বাড়াতে পারে
শুধু শারীরিক নয়, মানসিক কারণেও অনেক সময় শরীর গরম অনুভূত হতে পারে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা ভয় পেলে শরীরে অ্যাড্রেনালিনসহ বিভিন্ন স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়। এতে হৃদ্স্পন্দন বাড়ে, রক্তপ্রবাহের পরিবর্তন ঘটে এবং শরীরে গরম অনুভূত হতে পারে। অনেক নারী কর্মক্ষেত্র, পরিবার বা সামাজিক চাপের কারণে দীর্ঘদিন মানসিক চাপে থাকেন। এর প্রভাবও শরীরের তাপমাত্রা অনুভবের ওপর পড়তে পারে। তাই পর্যাপ্ত বিশ্রাম, মানসিক প্রশান্তি এবং নিয়মিত ব্যায়াম এ ধরনের সমস্যা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
গরম বেশি লাগলে কী করবেন
গরম বেশি লাগলে প্রথমেই পর্যাপ্ত পানি পান করা প্রয়োজন। শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিলে গরমের অস্বস্তি আরও বেড়ে যেতে পারে। ঢিলেঢালা সুতি পোশাক পরা, পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল করে এমন স্থানে থাকা এবং প্রয়োজন হলে ফ্যান বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহার করা আরাম দিতে পারে। অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার, অ্যালকোহল বা অতিরিক্ত ক্যাফেইন কিছু মানুষের ক্ষেত্রে শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে, তাই এসব খাবার পরিমিত গ্রহণ করা ভালো। নিয়মিত ব্যায়াম শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা উন্নত করতেও সহায়তা করে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত
সব সময় গরম লাগা স্বাভাবিক নাও হতে পারে। যদি দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত গরম অনুভূত হয়, অস্বাভাবিক ঘাম হয়, ওজন দ্রুত কমে যায়, হৃদ্স্পন্দন বেড়ে যায় বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ থাইরয়েডের সমস্যা, সংক্রমণ, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণেও এমন হতে পারে। বিশেষ করে মেনোপজের সময় হট ফ্ল্যাশ খুব বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
উপসংহার
মেয়েদের বেশি গরম লাগার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। হরমোনের পরিবর্তন, ঋতুচক্র, গর্ভাবস্থা, মেনোপজ, শরীরের গঠন, বিপাকক্রিয়া এবং মানসিক চাপ—সবকিছু মিলিয়েই এই অনুভূতি তৈরি হতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং উদ্বেগের কারণ নয়। তবে গরম লাগার সঙ্গে যদি অন্য অস্বাভাবিক উপসর্গ যুক্ত হয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পর্যাপ্ত পানি পান, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে এ ধরনের অস্বস্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!