আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য দোয়া করা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। বান্দা যখন বিনয়, আন্তরিকতা ও বিশ্বাসের সঙ্গে আল্লাহর কাছে কিছু চায়, তখন আল্লাহ তার দোয়া কবুল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আমার বান্দারা যখন আমার সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, (তখন বলুন) নিশ্চয়ই আমি নিকটবর্তী। আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে, আমি তার আহ্বানে সাড়া দিই।’ (সুরা বাকারা: ১৮৬)
জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে বিয়ে অন্যতম। অনেক তরুণ-তরুণী কাউকে পছন্দ করেন এবং তাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়ার আশা করেন। এ ক্ষেত্রে অনেকের মনে প্রশ্ন আসে, কোনো ছেলে বা মেয়ে যদি অন্য কারও সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে না জড়িয়ে শুধু আল্লাহর কাছে তাকে বিয়ের জন্য পাওয়ার দোয়া করে, তাহলে তা কি বৈধ? ইসলাম এ বিষয়ে কী নির্দেশনা দেয়?
ইসলামি স্কলারদের মতে, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা বৈধ। তবে শর্ত হলো, সেই সম্পর্ক যেন ইসলামের বিধানবহির্ভূত কোনো কাজে জড়িত না থাকে এবং দোয়ার মধ্যে কোনো গুনাহের বিষয় না থাকে।
দোয়া করার ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা
হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বান্দার দোয়া কবুল হতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত সে কোনো গুনাহের কাজ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়ে দোয়া না করে এবং দোয়া কবুলের ব্যাপারে তাড়াহুড়া না করে।
সাহাবিরা জানতে চাইলেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা.), দোয়ায় তাড়াহুড়া বলতে কী বোঝায়? তিনি বলেন, বান্দা বলতে থাকে—আমি দোয়া করেছি, কিন্তু আমার দোয়া কবুল হলো না। এরপর সে হতাশ হয়ে দোয়া করা ছেড়ে দেয়। (সহিহ মুসলিম: ৬৮২৯)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, দোয়ার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় থেকে বিরত থাকতে হবে।
প্রথমত, এমন কোনো বিষয়ের জন্য দোয়া করা যাবে না, যা আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয় বা গুনাহের কাজ।
দ্বিতীয়ত, আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করার উদ্দেশ্যে দোয়া করা যাবে না।
তৃতীয়ত, দোয়া করার পর দ্রুত ফল পাওয়ার জন্য অধৈর্য হওয়া যাবে না।
এসব বিষয় বাদ দিয়ে জীবনের কল্যাণকর যেকোনো বিষয়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া যায়।
পছন্দের মানুষকে বিয়ের জন্য দোয়ার সঠিক পদ্ধতি
ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে বিয়ের জন্য চাইলে আল্লাহর কাছে শর্তযুক্ত দোয়া করা উত্তম। কারণ মানুষ অনেক সময় কোনো বিষয়কে নিজের জন্য ভালো মনে করলেও আল্লাহ জানেন সেটি তার জন্য প্রকৃতপক্ষে কল্যাণকর কি না।
এভাবে দোয়া করা যেতে পারে—
‘হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তিকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়া যদি আমার দ্বীন, দুনিয়া ও ভবিষ্যতের জন্য কল্যাণকর হয়, তাহলে বিষয়টি আমার জন্য সহজ করে দিন। আর যদি এতে আমার জন্য অকল্যাণ থাকে, তাহলে তা আমার থেকে দূরে রাখুন এবং আমার জন্য উত্তম ব্যবস্থা করুন।’
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, এ ধরনের দোয়া বান্দার জন্য বেশি কল্যাণকর। কারণ এতে নিজের ইচ্ছার পাশাপাশি আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপরও আস্থা রাখা হয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হতে পারে, তোমরা কোনো বিষয় অপছন্দ কর অথচ তাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে। আবার হতে পারে, তোমরা কোনো বিষয় পছন্দ কর অথচ তাতে তোমাদের জন্য অকল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’ (সুরা বাকারা: ২১৬)
বিয়ের বিষয়ে ইস্তেখারার গুরুত্ব
কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পছন্দ করার পর শুধু আবেগের ওপর নির্ভর না করে আল্লাহর কাছে ইস্তেখারা করা উত্তম। ইস্তেখারার মাধ্যমে একজন মুসলিম আল্লাহর কাছে সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য দিকনির্দেশনা চান।
কারণ মানুষের জ্ঞান সীমিত, কিন্তু আল্লাহ ভবিষ্যতের সব বিষয় সম্পর্কে অবগত।
উত্তম জীবনসঙ্গীর জন্য কোরআনের দোয়া
পবিত্র কোরআনে উত্তম জীবনসঙ্গী লাভের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
হজরত মুসা (আ.)-এর দোয়া
হজরত মুসা (আ.) যখন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ছিলেন, তখন তিনি আল্লাহর কাছে এই দোয়া করেছিলেন—
رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ
উচ্চারণ: রাব্বি ইন্নি লিমা আনজালতা ইলাইয়া মিন খাইরিন ফাকির।
অর্থ: হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণ নাজিল করবেন, আমি তার মুখাপেক্ষী।
(সুরা আল-কাসাস: ২৪)
এই দোয়ার পর আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা (আ.)-এর জন্য আশ্রয়, জীবিকা এবং উত্তম জীবনসঙ্গীর ব্যবস্থা করেছিলেন।
উত্তম পরিবার লাভের দোয়া
আল্লাহ তাআলা কোরআনে আরও একটি দোয়া শিখিয়েছেন—
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
উচ্চারণ:
রাব্বানা হাবলানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া জুররিয়্যাতিনা কুররাতা আইউনিওঁ ওয়াজআলনা লিলমুত্তাকিনা ইমামা।
অর্থ:
হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ বানান।
(সুরা ফুরকান: ৭৪)
দোয়া কি শুধু নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য করা যাবে?
ইসলামি দৃষ্টিতে নির্দিষ্ট কাউকে বিয়ের জন্য পাওয়ার আশা করে দোয়া করা নিষিদ্ধ নয়। তবে সেই ব্যক্তির সঙ্গে হারাম সম্পর্ক, অশালীন যোগাযোগ বা ইসলামের সীমালঙ্ঘন করা যাবে না।
একজন মুসলিমের উচিত নিজের পছন্দের বিষয়টি আল্লাহর কাছে তুলে ধরা এবং একই সঙ্গে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকা।
কারণ কখনো মানুষ যাকে নিজের জন্য উত্তম মনে করে, আল্লাহ তার চেয়েও উত্তম কিছু নির্ধারণ করে রাখেন।
তাই বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দোয়া, ইস্তেখারা, পরিবারের পরামর্শ এবং শরিয়তের নির্দেশনা অনুসরণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!