অজু ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং নামাজসহ বহু ইবাদতের পূর্বশর্ত। একজন মুসলমানের জন্য পবিত্রতা অর্জন ছাড়া নামাজ আদায় বৈধ নয়। তাই অজু নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো—অজুর সময় কি নিয়ত করা জরুরি? আবার অনেকেই জানতে চান, অজু শুরু করার আগে মুখে নির্দিষ্ট কোনো নিয়ত পড়তে হবে কি না। এ বিষয়ে কোরআন, হাদিস এবং ফিকহবিদদের মতামত কী—তা জানা প্রতিটি মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামী শরিয়তে ‘নিয়ত’ বলতে বোঝায় আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো ইবাদত করার আন্তরিক ইচ্ছা। এটি মূলত অন্তরের বিষয়। ইসলামে নিয়তের গুরুত্ব এতটাই বেশি যে, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, “নিশ্চয়ই সব কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে, যা সে নিয়ত করেছে।” এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয় যে, প্রতিটি ইবাদতের মূল ভিত্তি হলো আন্তরিক নিয়ত।
তবে অজুর ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সহিহ হাদিসে এমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না, যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) অজু শুরু করার আগে মুখে নির্দিষ্ট শব্দে নিয়ত পড়েছেন অথবা সাহাবিদের তা পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে “আমি অজুর নিয়ত করলাম” বা এ ধরনের নির্দিষ্ট বাক্য উচ্চারণ করা সুন্নাহ হিসেবে প্রমাণিত নয়।
ইসলামী গবেষকরা বলেন, একজন ব্যক্তি যখন নামাজ পড়ার জন্য বা পবিত্রতা অর্জনের উদ্দেশ্যে অজু করতে যান, তখন তার অন্তরেই সেই নিয়ত বিদ্যমান থাকে। আলাদা করে মুখে নিয়ত উচ্চারণ করা ইবাদতের শর্ত নয়। বরং অন্তরে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অজু করার ইচ্ছাই প্রকৃত নিয়ত হিসেবে গণ্য হয়।
তবে ফিকহের বিভিন্ন মাজহাবে এ বিষয়ে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। হানাফি মাজহাবের আলেমদের মতে, অজুর জন্য নিয়ত করা সুন্নত। অর্থাৎ কেউ নিয়ত ছাড়াও অজু করলে তার অজু শুদ্ধ হবে, তবে নিয়ত করলে তিনি পূর্ণ সওয়াব লাভ করবেন। অন্যদিকে শাফেয়ি, মালেকি ও হাম্বলি মাজহাবে নিয়তকে অজুর অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাদের মতে, নিয়ত ছাড়া অজু শুদ্ধ হবে না।
আলেমরা বলেন, এসব মতপার্থক্য ফিকহি ইজতিহাদের অংশ। তাই একজন মুসলমানের উচিত নিজের অনুসৃত মাজহাবের নির্ভরযোগ্য আলেমদের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী আমল করা এবং এ বিষয় নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে না জড়ানো।
অজু শুরুর আগে কী বলা সুন্নত—এ প্রশ্নের উত্তর হাদিসে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) অজুর শুরুতে “বিসমিল্লাহ” বলার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। তাই অজু শুরু করার সময় “বিসমিল্লাহ” বলা সুন্নত আমল। এর মাধ্যমে একজন মুসলমান আল্লাহর নাম নিয়ে পবিত্রতার এই ইবাদত শুরু করেন।
ইসলামী বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, অজুর উদ্দেশ্য শুধু শরীর পরিষ্কার করা নয়; বরং এটি আত্মিক পবিত্রতা অর্জনেরও একটি মাধ্যম। তাই অজুর সময় মনোযোগ, আন্তরিকতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুখে কোনো নির্দিষ্ট নিয়ত না বললেও যদি অন্তরে ইবাদতের উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে সেটিই নিয়ত হিসেবে যথেষ্ট।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা বিভিন্ন বইয়ে অজুর জন্য দীর্ঘ নিয়ত প্রচলিত থাকলেও সহিহ হাদিসে এর ভিত্তি পাওয়া যায় না। তাই সুন্নাহ অনুযায়ী অজু করতে চাইলে “বিসমিল্লাহ” বলে অজু শুরু করা, সুন্নত পদ্ধতিতে অজুর অঙ্গগুলো ধোয়া এবং অন্তরে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত রাখাই উত্তম।
ইসলামের শিক্ষা হলো সহজতা ও আন্তরিকতা। তাই অজুর সময় মুখে নির্দিষ্ট নিয়ত উচ্চারণ করা বাধ্যতামূলক নয়। বরং অন্তরের নিয়তই ইবাদতের মূল ভিত্তি। একজন মুসলমান যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে অজু করেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তাহলে তিনি সুন্নাহ অনুযায়ী অজু সম্পন্ন করতে পারবেন। তাই অজু নিয়ে অযথা জটিলতায় না গিয়ে সহিহ হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী আমল করাই একজন মুমিনের জন্য সর্বোত্তম পথ।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!