বিয়ের পর যখন এই বাড়িতে এসেছিলাম, তখন আমাদের ঘর ছিল তিস্তা নদীর মাঝামাঝি। একে একে সব শেষ হয়ে গেছে। আটবার ঘর সরিয়েছি। এখন আর জানি না, কতবার ঘর হারালে সরকার আমাদের জন্য একটা স্থায়ী বাঁধ দেবে।

কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের পশ্চিম ছাতুনামা গ্রামের কেল্লাপাড়া এলাকার বাসিন্দা অফেজা বেগম। পেছনে তিস্তার গর্জন, সামনে নদীভাঙনের ক্ষতচিহ্ন। যে উঠানে বসে তিনি জীবনের গল্প বলছিলেন, সেই উঠানের একটি অংশও ইতোমধ্যে তিস্তা নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

স্বামী তোয়াল উদ্দিনের সঙ্গে কয়েক দশক ধরে তিস্তার ভাঙনের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছেন অফেজা বেগম। কিন্তু প্রতিবারই জয় হয়েছে নদীর। একের পর এক ভেঙে গেছে ঘর, আঙিনা, ফসলি জমি, গাছপালা এবং বহু বছরের স্মৃতি। আটবার ঘর সরিয়েও এখনও নিরাপদ আশ্রয়ের নিশ্চয়তা পাননি তারা।

অফেজা বেগমের মতো কেল্লাপাড়া ও আশপাশের এলাকার অসংখ্য পরিবারের জীবনও একই বাস্তবতায় আটকে আছে। বর্ষা এলেই শুরু হয় নতুন আতঙ্ক। নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে ভাঙনের ঝুঁকি। তাই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সবসময় গুছিয়ে রাখেন তারা। মাঝরাতে নদীর গর্জন শুনে ঘুম ভেঙে যায়, কখনো তড়িঘড়ি করে ঘর খুলে অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়, আবার কখনো চোখের সামনেই নদীতে তলিয়ে যায় বসতভিটা।

স্থানীয় বাসিন্দা আবু তালেব বলেন, তিস্তা পাড়ের মানুষের কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। বছরের পর বছর ধরে তারা ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করছেন। তার দাবি, এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

আরেক বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, তারা অতিরিক্ত কিছু চান না; শুধু এমন একটি টেকসই বাঁধ চান, যাতে জীবনের বাকি সময়টুকু নিশ্চিন্তে কাটাতে পারেন। বারবার ঘর নির্মাণ করার মতো আর্থিক ও মানসিক শক্তি তাদের আর নেই।

এ বিষয়ে ডিমলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরি জানান, যেসব এলাকায় নদীভাঙন দেখা দিচ্ছে, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কেল্লাপাড়া এলাকায় নদীভাঙন ঠেকাতে প্রায় ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে জিওব্যাগ ফেলার কাজ চলছে।

অন্যদিকে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরানুজ্জামান বলেন, তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে পানিবন্দি মানুষের জন্য শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকতে উপজেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।

তবে নদীপাড়ের মানুষের দাবি, সাময়িক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নয়, তিস্তার ভাঙন থেকে স্থায়ী মুক্তির জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি। তাদের আশা, একদিন হয়তো নদীভাঙনের আতঙ্ক ছাড়াই নিজের ঘরে নিশ্চিন্তে বসবাস করতে পারবেন।