মানুষের জীবনের পরিবর্তন কখন, কীভাবে আসবে—তা কেউ জানে না। কখনো একটি উপদেশ, একটি আয়াত কিংবা একটি হাদিস মানুষের চিন্তা, চরিত্র ও পুরো জীবনকে বদলে দিতে পারে। ইসলামের ইতিহাসে এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেখানে একজন মানুষ গুনাহের অন্ধকার ছেড়ে হেদায়াতের আলোয় ফিরে এসেছেন।
তেমনই এক অনন্য ঘটনা আবদুল্লাহ ইবনে মাসলামা আল-কা’নাবি (রহ.)-এর জীবনে। যিনি পরবর্তীতে ইমাম মালেক (রহ.)-এর অন্যতম প্রসিদ্ধ ছাত্র, বিখ্যাত হাদিস বর্ণনাকারী এবং একজন প্রখ্যাত ফকিহ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। অথচ তার যৌবনের শুরুটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি ছিলেন উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনে অভ্যস্ত এবং নানা অনাচারে জড়িয়ে পড়েছিলেন।
উচ্ছৃঙ্খল জীবন থেকে হেদায়াতের পথে
আবদুল্লাহ ইবনে মাসলামা আল-কা’নাবি (রহ.)-এর জন্ম হিজরি ১৩০ সালের কিছু পরে। তার জন্ম মদিনায় হলেও তিনি পরবর্তীতে বসরায় বসবাস করতেন।
তরুণ বয়সে তিনি বন্ধুদের সঙ্গে দিনভর নানা ধরনের অনৈতিক কাজে জড়িয়ে থাকতেন। এমনকি মদপানের অভ্যাসও ছিল তার। সে সময় তার জীবন ছিল আল্লাহর আনুগত্য থেকে অনেক দূরে।
একদিন তিনি তার বন্ধুদের দাওয়াত করে তাদের অপেক্ষায় রাস্তার পাশে বসেছিলেন। ঠিক সে সময় ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন তৎকালীন বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম শু’বা ইবনে হাজ্জাজ (রহ.)। তিনি গাধায় আরোহন করেছিলেন এবং তার চারপাশে ছিলেন অসংখ্য শিক্ষার্থী ও ভক্ত।
আবদুল্লাহ জানতে চাইলেন, ‘এই ব্যক্তি কে?’
লোকেরা বলল, ‘তিনি শু’বা।’
তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, ‘শু’বা কে?’
তারা জানালেন, ‘তিনি একজন বড় মুহাদ্দিস ও হাদিসবিশারদ।’
একটি হাদিস বদলে দিল পুরো জীবন
আবদুল্লাহ আল-কা’নাবি তার আগের উচ্ছৃঙ্খল অবস্থাতেই ইমাম শু’বা (রহ.)-এর কাছে গেলেন। তিনি উদ্ধতভাবে বললেন, ‘আমাকে একটি হাদিস শোনান।’
ইমাম শু’বা (রহ.) তার অবস্থা দেখে বললেন, ‘তুমি এখন হাদিস শোনার উপযুক্ত অবস্থায় নেই।’
এ কথা শুনে আবদুল্লাহ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন। তিনি ছুরি বের করে বললেন, ‘আমাকে হাদিস শোনান, না হলে আমি আপনাকে আঘাত করব।’
এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও ইমাম শু’বা (রহ.) ধৈর্য হারাননি। তিনি একটি হাদিস বর্ণনা করলেন।
তিনি বলেন, মনসুর রিবঈ, আবু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا لَمْ تَسْتَحِ فَاصْنَعْ مَا شِئْتَ
অর্থ: ‘যদি তোমার লজ্জা না থাকে, তবে যা ইচ্ছা তাই করতে পারো।’
(সহিহ বুখারি)
হাদিসের এই ছোট্ট বাক্যটি আবদুল্লাহ আল-কা’নাবির হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলল। তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন। তার হাত থেকে ছুরি পড়ে গেল।
একটি মাত্র হাদিস তার চিন্তার জগৎ বদলে দিল।
গুনাহ ছেড়ে তওবার পথে
হাদিস শোনার পর আবদুল্লাহ নিজের ঘরে ফিরে গেলেন। এরপর ঘরে থাকা সব মদ নষ্ট করে ফেললেন।
তিনি তার মাকে বললেন, ‘আমার বন্ধুরা যখন আসবে, তাদের ঘরে বসিয়ে খাবার দেবেন। তারা খাওয়া শেষ করলে তাদের জানিয়ে দেবেন যে, আমি আমার সব মদ ধ্বংস করে দিয়েছি।’
এরপর তিনি আগের জীবন থেকে সম্পূর্ণ ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে তিনি মদিনার পথে যাত্রা করেন।
ইমাম মালেকের সান্নিধ্যে ৩০ বছর
মদিনায় গিয়ে আবদুল্লাহ আল-কা’নাবি (রহ.) বিখ্যাত ইমাম মালেক ইবনে আনাস (রহ.)-এর ছাত্রত্ব গ্রহণ করেন।
তিনি দীর্ঘ ৩০ বছর ইমাম মালেক (রহ.)-এর সান্নিধ্যে কাটান। তার কাছ থেকে হাদিস শিক্ষা করেন এবং ইসলামী ফিকহের জ্ঞান অর্জন করেন।
একসময় সেই উচ্ছৃঙ্খল যুবকই পরিণত হন একজন মহান আলেমে। তিনি ইমাম মালেক (রহ.)-এর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-মুয়াত্তা-এর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।
ইবনে আবি হাতেম (রহ.) বলেন, তিনি তার বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আল-মুয়াত্তার বর্ণনাকারী হিসেবে আপনার কাছে আবদুল্লাহ আল-কা’নাবি বেশি প্রিয়, নাকি ইসমাইল ইবনে আবি উওয়াইস?’
তার বাবা উত্তর দেন, ‘অবশ্যই আল-কা’নাবি। আমি তার চেয়ে বেশি খোদাভীরু আর কাউকে দেখিনি।’
একটি ভালো কথার শক্তি
দীর্ঘ সময় মদিনায় থাকার পর আবদুল্লাহ আল-কা’নাবি (রহ.) বসরায় ফিরে যান। ততদিনে ইমাম শু’বা (রহ.) ইন্তেকাল করেছেন। ফলে তার কাছ থেকে আর কোনো হাদিস শোনার সুযোগ হয়নি।
কিন্তু তিনি ইমাম শু’বা (রহ.)-এর কাছ থেকে যে একটি হাদিস শুনেছিলেন, সেটিই তার জীবন পরিবর্তনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
(সিয়ারু আ’লামিন নুবালা: ১০/২৫৯)
এই ঘটনা আমাদের বড় শিক্ষা দেয়—আল্লাহ তাআলা চাইলে একটি মাত্র উত্তম কথা, একটি আয়াত কিংবা একটি হাদিসের মাধ্যমেও মানুষের অন্তর পরিবর্তন করে দিতে পারেন।
তাই কাউকে ভালো পথে আহ্বান করার সুযোগ এলে তা হাতছাড়া করা উচিত নয়। কারণ কখন কোন নসিহত একজন মানুষের জীবন বদলে দেবে, তা কেউ জানে না।
মানুষ যত বড় গুনাহেই জড়িয়ে পড়ুক না কেন, আল্লাহর রহমতের দরজা তার জন্য খোলা থাকে। আন্তরিক তওবা, আত্মশুদ্ধি ও সঠিক পথে ফিরে আসার মাধ্যমে একজন মানুষও আল্লাহর প্রিয় বান্দা হয়ে উঠতে পারে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!