রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বসবাসকারী মানুষের দৈনন্দিন পানির প্রধান উৎস হলো ওয়াসা বা সিটি করপোরেশনের সরবরাহকৃত পানি। তবে অনেক সময় কলের পানিতে দুর্গন্ধ, ক্লোরিনের গন্ধ কিংবা রঙের সামান্য পরিবর্তন দেখা যায়। এমন পরিস্থিতিতে অনেক মুসলমানের মনে প্রশ্ন জাগে—এই পানি কি পবিত্র? এটি দিয়ে অজু বা ফরজ গোসল করলে তা কি শরিয়ত অনুযায়ী শুদ্ধ হবে?
ইসলামি শরিয়তের মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো বস্তুর পবিত্রতা নিশ্চিতভাবে নষ্ট হয়েছে—এমন প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত সেটিকে পবিত্রই গণ্য করা হয়। তাই শুধুমাত্র সন্দেহ বা গন্ধের কারণে কোনো পানিকে অপবিত্র বলা যায় না।
ইসলামে পানির পবিত্রতার মূলনীতি
ফিকহের একটি স্বীকৃত নীতি হলো—
“যা নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত, তা শুধুমাত্র সন্দেহের কারণে বাতিল হয় না।”
এই নীতির আলোকে ওয়াসা বা সাপ্লাইয়ের পানিকে মূলত পবিত্র ধরা হবে। কারণ কর্তৃপক্ষ মানুষের ব্যবহারের জন্য নিরাপদ ও পরিষ্কার পানি সরবরাহ করে। তাই বিপরীত কোনো নিশ্চিত প্রমাণ না থাকলে সেই পানি দিয়ে অজু, গোসল বা অন্যান্য পবিত্রতার কাজ করা বৈধ।
পানির গন্ধ বা রং বদলালে কী হবে?
পানির রং, গন্ধ বা স্বাদ পরিবর্তনের কারণের ওপর শরিয়তের বিধান নির্ভর করে।
১. যদি নাপাক বস্তুর কারণে পরিবর্তন হয়
যদি নির্ভরযোগ্যভাবে জানা যায় যে, ড্রেনের ময়লা, মলমূত্র বা অন্য কোনো অপবিত্র বস্তু মিশে পানির রং, গন্ধ বা স্বাদ পরিবর্তিত হয়েছে, তাহলে সেই পানি নাপাক হিসেবে গণ্য হবে।
এ অবস্থায়—
অজু করা যাবে না। ফরজ গোসল হবে না। পান করা বা রান্নায় ব্যবহার করাও উচিত নয়।
২. যদি ক্লোরিন বা শোধনকারী পদার্থের কারণে পরিবর্তন হয়
ওয়াসার পানি বিশুদ্ধ করার জন্য ক্লোরিনসহ বিভিন্ন শোধনকারী উপাদান ব্যবহার করা হয়।
এসব পদার্থ পবিত্র হওয়ায় এগুলোর কারণে পানির গন্ধ বা রং কিছুটা পরিবর্তিত হলেও পানি অপবিত্র হয় না।
এ ধরনের পানি দিয়ে—
অজু করা বৈধ। ফরজ গোসল করা বৈধ। নামাজ আদায় করা বৈধ।
শুধু সন্দেহের কারণে পানি নাপাক বলা যাবে?
না।
ইসলামে অযথা সন্দেহ (ওয়াসওয়াসা) নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
যদি নিশ্চিতভাবে জানা না যায় যে পানিতে নাপাক কিছু মিশেছে, তাহলে কেবল গন্ধ বা রঙের পরিবর্তনের কারণে সেটিকে অপবিত্র বলা যাবে না।
দুর্গন্ধ থাকলে কী করবেন?
কখনও কখনও পাইপলাইনের কারণে বা দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে সাময়িক দুর্গন্ধ হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে—
কিছুক্ষণ পানি প্রবাহিত হতে দিন। সম্ভব হলে পরিষ্কার পাত্রে নিয়ে দেখুন। দৃশ্যমান অপবিত্রতা আছে কি না যাচাই করুন।
যদি অপবিত্রতার নিশ্চিত প্রমাণ না থাকে, তাহলে সেই পানি ব্যবহার করা বৈধ।
কখন সেই পানি ব্যবহার না করাই ভালো?
নিম্নোক্ত পরিস্থিতিতে সতর্ক থাকা উচিত—
ক. ড্রেনের পানি মিশেছে বলে নিশ্চিত জানা যায়।
খ. পানিতে দৃশ্যমান ময়লা বা অপবিত্র বস্তু দেখা যায়।
গ. সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পানি ব্যবহার না করার নির্দেশ দেয়।
ঘ. পানির গন্ধ ও রং স্পষ্টভাবে অপবিত্রতার ইঙ্গিত দেয় এবং নির্ভরযোগ্যভাবে তার কারণ নিশ্চিত হয়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিকল্প পানি ব্যবহার করাই উত্তম।
ইসলাম কী শিক্ষা দেয়?
ইসলাম পরিচ্ছন্নতা ও সহজতার ধর্ম।
তাই অকারণে সন্দেহ সৃষ্টি করে মানুষকে কষ্টে ফেলা ইসলামের উদ্দেশ্য নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কোনো অপবিত্রতার প্রমাণ না পাওয়া যায়, ততক্ষণ ওয়াসা বা সাপ্লাইয়ের পানিকে পবিত্র ধরে অজু ও গোসল করা বৈধ।
সাপ্লাইয়ের পানিতে সাধারণ ক্লোরিনের গন্ধ, শৈবালজনিত সামান্য পরিবর্তন বা রঙের হালকা পার্থক্য থাকলেই তা নাপাক হয়ে যায় না। নিশ্চিতভাবে নাপাক কিছু মিশেছে—এমন প্রমাণ না থাকলে সেই পানি দিয়ে অজু, গোসল ও অন্যান্য ইবাদত করা শরিয়তসম্মত। তবে যদি নির্ভরযোগ্যভাবে অপবিত্রতার বিষয়টি নিশ্চিত হয়, তাহলে সেই পানি ব্যবহার থেকে বিরত থেকে বিকল্প পবিত্র পানি ব্যবহার করাই উচিত।
FAQ
ওয়াসার পানি দিয়ে অজু করা কি জায়েজ?
হ্যাঁ। নিশ্চিতভাবে নাপাক কিছু মিশেছে এমন প্রমাণ না থাকলে ওয়াসার পানি দিয়ে অজু করা জায়েজ।
ক্লোরিনের গন্ধ থাকলে কি পানি অপবিত্র হয়ে যায়?
না। পানি শোধনের জন্য ব্যবহৃত ক্লোরিনের কারণে গন্ধ পরিবর্তন হলেও পানি অপবিত্র হয় না।
দুর্গন্ধযুক্ত সাপ্লাইয়ের পানি দিয়ে গোসল করলে কি ফরজ আদায় হবে?
যদি দুর্গন্ধের কারণ নাপাক বস্তু হওয়ার প্রমাণ না থাকে, তাহলে সেই পানি দিয়ে গোসল করলে শরিয়ত অনুযায়ী গোসল শুদ্ধ হবে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!