বর্ষাকাল, ঋতু পরিবর্তন কিংবা ভাইরাসজনিত সংক্রমণের সময় বাংলাদেশে “চোখ ওঠা” রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। হঠাৎ এক বা দুই চোখ লাল হয়ে যাওয়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া, চুলকানি, জ্বালাপোড়া কিংবা ঘুম থেকে ওঠার পর চোখের পাতা আঠার মতো লেগে থাকা—এসব লক্ষণ দেখা দিলে অনেকেই একে চোখ ওঠা বলে থাকেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে কনজাংকটিভাইটিস (Conjunctivitis) বা পিংক আই (Pink Eye) বলা হয়।
চোখ ওঠা সাধারণত প্রাণঘাতী নয়, তবে এটি দ্রুত ছড়াতে পারে। বিশেষ করে ভাইরাসজনিত বা ব্যাকটেরিয়াজনিত কনজাংকটিভাইটিস পরিবার, স্কুল, অফিস কিংবা কর্মস্থলে সহজেই অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তাই আক্রান্ত হলে আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনেকেই মনে করেন চোখে তাকালে বা চোখের দিকে সরাসরি দেখলে এই রোগ ছড়ায়। বাস্তবে এটি একটি ভুল ধারণা। চোখ ওঠা সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির চোখের পানি, হাত, তোয়ালে, বালিশ, রুমাল বা অন্যান্য ব্যবহৃত সামগ্রীর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তাই ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাই রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
চোখ ওঠার কারণ
চোখ ওঠার প্রধান কারণ হলো ভাইরাসজনিত সংক্রমণ। এছাড়া ব্যাকটেরিয়া, অ্যালার্জি, ধুলাবালি, ধোঁয়া, রাসায়নিক পদার্থ কিংবা দূষিত পরিবেশের কারণেও চোখ লাল হতে পারে।
ভাইরাসজনিত কনজাংকটিভাইটিস সবচেয়ে বেশি সংক্রামক। আক্রান্ত ব্যক্তির হাত, চোখের পানি বা ব্যবহৃত জিনিসের মাধ্যমে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে অ্যালার্জিজনিত চোখ ওঠা সাধারণত সংক্রামক নয়। এটি ধুলাবালি, ফুলের রেণু, পশুর লোম বা অন্যান্য অ্যালার্জেনের কারণে হতে পারে।
চোখ ওঠার লক্ষণ
চোখ ওঠার প্রথম লক্ষণ সাধারণত চোখ লাল হয়ে যাওয়া। এর সঙ্গে চোখে জ্বালাপোড়া, চুলকানি, পানি পড়া এবং অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর চোখের পাতা সাদা বা হলুদ আঠালো পদার্থের কারণে আটকে যায়।
এছাড়া চোখে বালু পড়ার মতো অনুভূতি, আলোতে তাকাতে কষ্ট হওয়া, চোখ ফুলে যাওয়া এবং চোখ দিয়ে অতিরিক্ত পানি পড়াও সাধারণ লক্ষণ। ভাইরাসজনিত সংক্রমণে সাধারণত এক চোখ দিয়ে শুরু হয়ে পরে অন্য চোখেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
যদি চোখে তীব্র ব্যথা, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, অতিরিক্ত আলোতে অসহ্য অনুভূতি বা কর্নিয়ায় সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে এটি সাধারণ চোখ ওঠা নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
চোখ উঠলে কি ড্রপ দিতে হয়
সব ধরনের চোখ ওঠায় ড্রপের প্রয়োজন হয় না। অনেক ভাইরাসজনিত সংক্রমণ কয়েক দিনের মধ্যে নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায় এবং এ সময় কৃত্রিম অশ্রু (Artificial Tears) ব্যবহার করলে আরাম পাওয়া যায়।
যদি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের লক্ষণ থাকে, যেমন ঘন পুঁজ বের হওয়া বা তীব্র সংক্রমণ, তাহলে চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক আই ড্রপ দিতে পারেন। নিজের ইচ্ছামতো ওষুধের দোকান থেকে ড্রপ কিনে ব্যবহার না করে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
চোখ উঠার ড্রপ এর নাম
চোখ ওঠার জন্য কোন ড্রপ ব্যবহার করবেন, তা নির্ভর করে রোগের কারণের ওপর। ভাইরাসজনিত সংক্রমণে সাধারণত লুব্রিকেটিং (Artificial Tears) আই ড্রপ এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক আই ড্রপ দিতে পারেন।
গুরুত্বপূর্ণ: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো অ্যান্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েডযুক্ত আই ড্রপ ব্যবহার করবেন না। ভুল ড্রপ ব্যবহার করলে সংক্রমণ বাড়তে পারে বা কর্নিয়ার ক্ষতি হতে পারে।
বাচ্চাদের চোখ উঠলে করণীয় কি
শিশুদের চোখ উঠলে প্রথমেই আতঙ্কিত না হয়ে একজন শিশু বিশেষজ্ঞ বা চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। শিশুর চোখ পরিষ্কার রাখতে হবে এবং তাকে বারবার চোখ ঘষতে দেওয়া যাবে না। পরিষ্কার তুলা বা নরম কাপড় দিয়ে চোখের ময়লা আলতোভাবে পরিষ্কার করতে হবে।
স্কুলে পাঠানোর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত, কারণ ভাইরাসজনিত সংক্রমণ সহজেই অন্য শিশুদের মধ্যে ছড়াতে পারে। শিশুর ব্যবহৃত তোয়ালে, বালিশ, রুমাল ও খেলনা পরিষ্কার রাখা জরুরি।
চোখ উঠার ঘরোয়া চিকিৎসা
চোখ ওঠার ক্ষেত্রে ঘরোয়া পরিচর্যা রোগীর অস্বস্তি অনেকটাই কমাতে পারে। তবে ঘরোয়া চিকিৎসা কখনোই চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।
প্রথমেই চোখ পরিষ্কার রাখতে হবে। পরিষ্কার ফুটানো ঠান্ডা পানি বা জীবাণুমুক্ত স্যালাইন দিয়ে চোখের চারপাশ আলতোভাবে পরিষ্কার করা যেতে পারে। চোখে বারবার হাত দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
পরিষ্কার নরম কাপড় ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে চোখের ওপর কয়েক মিনিট সেঁক দিলে ফোলাভাব ও জ্বালাপোড়া কমতে পারে। ব্যক্তিগত তোয়ালে, রুমাল, বালিশ বা প্রসাধনী অন্য কারও সঙ্গে ভাগাভাগি করা যাবে না।
কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহার করলে তা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে। চোখে নিজে থেকে স্টেরয়েডযুক্ত ড্রপ বা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ সব ধরনের চোখ ওঠায় একই চিকিৎসা প্রযোজ্য নয়।
চোখ উঠলে কি দোয়া পড়তে হয়
ইসলামে অসুস্থতার সময় আল্লাহর কাছে দোয়া করা এবং সুস্থতা কামনা করা উৎসাহিত করা হয়েছে। চোখ উঠলে নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ দোয়া বাধ্যতামূলক নয়। তবে কুরআনের দোয়া, সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে আল্লাহর কাছে শিফা প্রার্থনা করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, দোয়ার পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করাও ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
চোখ উঠলে কি কি খাওয়া যাবে না?
চোখ ওঠার জন্য নির্দিষ্ট কোনো খাবার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়। তবে অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত ও অস্বাস্থ্যকর খাবার কম খাওয়া ভালো। পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং ফল, শাকসবজি ও ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করুন।
চোখ উঠলে করণীয় কি ড্রপ দিতে হয়?
সব ক্ষেত্রে ড্রপের প্রয়োজন হয় না। ভাইরাসজনিত সংক্রমণে সাধারণত লুব্রিকেটিং ড্রপ ব্যবহার করা হয়। অ্যান্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েড ড্রপ শুধুমাত্র চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যবহার করা উচিত।
ঘরোয়া পদ্ধতিতে চোখ ফোলা দূর করার উপায়?
পরিষ্কার ঠান্ডা সেঁক, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, চোখ পরিষ্কার রাখা এবং চোখ না ঘষা ফোলাভাব কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে ব্যথা বা দৃষ্টিশক্তি কমে গেলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
চোখ উঠলে কি চোখে পানি দেওয়া যাবে?
হ্যাঁ। পরিষ্কার বা ফুটিয়ে ঠান্ডা করা পানি অথবা জীবাণুমুক্ত স্যালাইন দিয়ে চোখের চারপাশ পরিষ্কার করা যায়। তবে অপরিষ্কার পানি বা পুকুরের পানি ব্যবহার করা উচিত নয়।
উপসংহার
চোখ ওঠা সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়, তবে সঠিক পরিচর্যা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চোখে বারবার হাত না দেওয়া, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র আলাদা ব্যবহার করা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার মাধ্যমে জটিলতা এড়ানো সম্ভব। যদি চোখে তীব্র ব্যথা, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া বা কয়েক দিনের মধ্যেও অবস্থার উন্নতি না হয়, তাহলে অবশ্যই দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!