গ্রামের অসচ্ছল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রান্নার জ্বালানি সংকট কমাতে সাশ্রয়ী মূল্যে এলপিজি (লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সিলিন্ডার সরবরাহের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। কাঠ, খড়কুটো ও ঘুঁটের মতো প্রচলিত জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব রান্নার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এলপিজিতে ভর্তুকি দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শিগগিরই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু হতে পারে। সরকারের এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রান্নার ধোঁয়ার কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জনস্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিসিসের (আইইইএফএ) বাংলাদেশের জ্বালানি খাতবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, প্রান্তিক মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে এলপিজি সরবরাহ একটি ভালো উদ্যোগ। প্রতিবেশী ভারতেও এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে।
তবে তিনি বলেন, শুধু গ্রামের মানুষ নয়, ঢাকা ও অন্যান্য শহরের বস্তিতে বসবাসকারী দরিদ্র পরিবারগুলোকেও এই সুবিধার আওতায় আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রকৃত অসচ্ছল পরিবার চিহ্নিত করে একটি নির্ভুল ডাটাবেস তৈরি করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভর্তুকি দেওয়া এলপিজি যেন বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার বা অন্যত্র বিক্রি না হয়, তা নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। স্বচ্ছ বিতরণ ব্যবস্থা না থাকলে এই উদ্যোগের সুফল প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের অনেক গ্রামীণ পরিবার রান্নার কাজে কাঠ, খড়কুটো ও ঘুঁটের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে একদিকে বনাঞ্চলের ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে রান্নার ধোঁয়া থেকে নারী ও শিশুদের শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
বর্তমানে গ্রামের কিছু সচ্ছল পরিবার এলপিজি ব্যবহার করলেও উচ্চমূল্যের কারণে অনেকেই নিয়মিতভাবে এই জ্বালানি ব্যবহার করতে পারছেন না। দেশে বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং যানবাহনে এলপিজির ব্যবহার রয়েছে।
গত সাত বছরে দেশে এলপিজির ব্যবহার দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ১৫ লাখ টনের ওপরে পৌঁছেছে। এর প্রায় ৮০ শতাংশই ব্যবহৃত হয় বাসাবাড়ির রান্নার কাজে। বর্তমানে দেশের এলপিজি বাজারের গড় মাসিক চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টন।
দেশে সরবরাহ করা এলপিজির প্রায় ৯৮ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। সরকারি ব্যবস্থায় সরবরাহ করা হয় মাত্র ২ শতাংশ। সরকারি কোম্পানির ১২ দশমিক ৫ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৮২৫ টাকা হলেও বেসরকারি পর্যায়ে এর দাম অনেক বেশি।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে। তবে অনেক ক্ষেত্রে খুচরা বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রান্তিক মানুষের জ্বালানি সমস্যা সমাধানে ভর্তুকি ও বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে কাজ করছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের এলপিজি ভর্তুকি কর্মসূচি অন্যতম বড় উদাহরণ। দেশটিতে দরিদ্র পরিবারগুলোকে এলপিজি সংযোগ দেওয়ার পাশাপাশি সরাসরি ব্যাংক হিসাবে ভর্তুকির অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
ভারতের এই ব্যবস্থায় সুবিধাভোগীরা বাজারমূল্যে সিলিন্ডার কিনলেও সরকার নির্ধারিত ভর্তুকির অর্থ সরাসরি তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠায়। ফলে মধ্যস্বত্বভোগী ও অনিয়মের সুযোগ কমে যায়।
অন্যদিকে পাকিস্তানেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র পরিবারের জন্য বিভিন্ন সময়ে কম দামে বা নির্দিষ্ট কোটায় এলপিজি সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে প্রস্তাবিত এলপিজি ভর্তুকি কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে প্রান্তিক মানুষের রান্নার জ্বালানি ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্যসূত্র: আগামীর সময়
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!