দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হলে মানুষের জীবনযাত্রার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়ে যায়। জলাবদ্ধতা, বিশুদ্ধ পানির সংকট, নিরাপদ খাবারের অভাব এবং বিভিন্ন সংক্রামক রোগের কারণে শিশু, বয়স্ক ও গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। এমন পরিস্থিতিতে বন্যাকবলিত এলাকা এবং আশপাশে বসবাসকারী মানুষের জন্য ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশ কার্যালয়।

সোমবার (১৩ জুলাই) সংস্থাটি তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক সচেতনতামূলক বার্তায় জানায়, বন্যার সময় জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আগে থেকেই প্রয়োজনীয় সতর্কতা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। ডব্লিউএইচওর মতে, সচেতনতা ও কিছু সহজ নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুসরণ করলে অনেক দুর্ঘটনা এবং রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

পানিতে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি

বন্যার সময় সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো পানিতে ডুবে যাওয়া। অনেক সময় রাস্তা, খাল, ডোবা কিংবা খোলা ম্যানহোল পানির নিচে ঢেকে যায়। ফলে গভীরতা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে এবং দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের একা পানির কাছাকাছি যেতে না দেওয়া এবং সাঁতার না জানা ব্যক্তিদের প্রয়োজন ছাড়া পানিতে নামতে নিষেধ করার পরামর্শ দিয়েছে ডব্লিউএইচও। প্রয়োজনে লাইফ জ্যাকেট বা নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি

বন্যার পানির সঙ্গে বৈদ্যুতিক তার বা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির সংস্পর্শ হলে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই পানি জমে থাকা এলাকায় কোনো বৈদ্যুতিক সংযোগ চালু থাকলে সেখানে প্রবেশ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ঘরে পানি ঢুকে গেলে মূল বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করা এবং বিদ্যুৎ বিভাগের অনুমতি ছাড়া পুনরায় সংযোগ ব্যবহার না করাই নিরাপদ।

দূষিত পানি থেকে রোগ ছড়ানো

বন্যার সময় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে পানীয় পানির উৎস বন্যার পানিতে দূষিত হয়ে পড়ে। এর ফলে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস-এসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। ডব্লিউএইচওর পরামর্শ অনুযায়ী, সবসময় ফুটিয়ে বা বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করে পানি পান করা উচিত। নিরাপদ পানির অভাবে বোতলজাত বা নির্ভরযোগ্য উৎসের পানি ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ।

দূষিত খাবার থেকে সংক্রমণের আশঙ্কা

বন্যার সময় দীর্ঘক্ষণ বাইরে রাখা বা বন্যার পানির সংস্পর্শে আসা খাবার খাওয়া উচিত নয়। এতে খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। রান্না করা খাবার ঢেকে রাখা, দ্রুত খেয়ে ফেলা এবং নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তা ফেলে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি খাবার তৈরির আগে ও খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে

জলাবদ্ধতার কারণে বন্যার পরপরই মশার বংশবিস্তার বেড়ে যায়। এর ফলে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। তাই মশারি ব্যবহার, জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ, ফুলহাতা পোশাক পরা এবং প্রয়োজন হলে মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছে ডব্লিউএইচও।

সাপের কামড়ের ঝুঁকি

বন্যার সময় অনেক সাপ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে লোকালয়ে চলে আসে। ফলে ঘরবাড়ি, ত্রাণকেন্দ্র কিংবা পানিবেষ্টিত এলাকায় সাপের কামড়ের ঘটনা বাড়তে পারে। তাই হাঁটার সময় সতর্ক থাকা, রাতে টর্চ ব্যবহার করা এবং পানি বা ঝোপঝাড়ে হাত দেওয়ার আগে ভালোভাবে দেখে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সাপ কামড়ালে ওঝা বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

বন্যার সময় স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আরও কিছু করণীয়

ডব্লিউএইচও বলছে, বন্যার সময় ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী হাতের কাছে রাখা এবং সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে জ্বর, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

আরও পড়ুন-নকল ও ভেজাল ওষুধ বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি, সংসদে সরকারের পরিকল্পনা জানালেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী

বন্যা শুধু বসতঘর বা সম্পদের ক্ষতিই করে না, মানুষের স্বাস্থ্যকেও বড় ঝুঁকির মুখে ফেলে। তবে সচেতনতা, নিরাপদ পানি ও খাবার গ্রহণ, বিদ্যুৎ ও পানির বিষয়ে সতর্কতা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে অনেক ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। তাই ডব্লিউএইচওর পরামর্শগুলো মেনে চলার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনাও অনুসরণ করা উচিত।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!