বাংলাদেশে বর্ষাকাল এলেই ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বেড়ে যায়। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। আগে ডেঙ্গু একটি শহরকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে এটি দেশের প্রায় সব এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। তাই শিশু, তরুণ, বয়স্ক, সব বয়সের মানুষেরই ডেঙ্গু সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত এডিস (Aedes) মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়ায়। সাধারণ জ্বর মনে করে অনেকেই শুরুতে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু সময়মতো সঠিক চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের অভাবে রোগীর অবস্থা দ্রুত জটিল হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু হলে বা শরীরে সতর্ক সংকেত দেখা দিলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
ডেঙ্গু জ্বরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোগের লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া, পর্যাপ্ত তরল পান করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা। একই সঙ্গে পরিবার ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার মাধ্যমে এডিস মশার বিস্তার রোধ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই লেখায় ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও করণীয়, শিশু ও বড়দের ডেঙ্গুর লক্ষণ, দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু হলে কী হয়, কখন হাসপাতালে যেতে হবে এবং কীভাবে নিরাপদে চিকিৎসা নেওয়া যায়, এসব বিষয় সহজ ভাষায় বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও করণীয়
ডেঙ্গু জ্বর সাধারণত এডিস মশার কামড়ের ৪ থেকে ১০ দিনের মধ্যে দেখা দেয়। শুরুতে অনেকেরই সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতো মনে হলেও কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণের মাধ্যমে এটি শনাক্ত করা সম্ভব। সময়মতো লক্ষণগুলো বুঝতে পারলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায় এবং জটিলতার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
ডেঙ্গু জ্বরের সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—
- হঠাৎ ১০২–১০৪ ডিগ্রি পর্যন্ত জ্বর
- তীব্র মাথাব্যথা
- চোখের পেছনে ব্যথা
- শরীর ও জয়েন্টে প্রচণ্ড ব্যথা
- পেশিতে ব্যথা
- দুর্বলতা ও ক্লান্তি
- ক্ষুধামন্দা
- বমি বমি ভাব বা বমি
- কিছু ক্ষেত্রে নাক বা মাড়ি থেকে রক্ত পড়া
অনেক রোগীর ক্ষেত্রে প্রথম দুই থেকে তিন দিন জ্বর বেশি থাকে। এরপর জ্বর কমে গেলেও রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছেন—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ ডেঙ্গুর জটিল পর্যায় অনেক সময় জ্বর কমার পরই শুরু হয়। এ সময় রক্তের প্লাজমা বের হয়ে যাওয়া, রক্তচাপ কমে যাওয়া বা প্লেটলেট কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ডেঙ্গু জ্বর হলে আতঙ্কিত না হয়ে প্রথমেই বিশ্রাম নিতে হবে। পর্যাপ্ত পানি, ডাবের পানি, ওরস্যালাইন, লেবুর শরবত, ফলের রস বা অন্যান্য তরল খাবার বেশি করে পান করতে হবে যাতে শরীরে পানিশূন্যতা না হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের ব্যথানাশক ওষুধ, বিশেষ করে আইবুপ্রোফেন বা ডাইক্লোফেনাক জাতীয় ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। সাধারণত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল ব্যবহার করা হয়।
একই সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা, বিশেষ করে CBC, NS1 Antigen বা IgM/IgG পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর শ্বাসকষ্ট, বারবার বমি, পেটব্যথা, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা রক্তক্ষরণ শুরু হলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
শিশুদের ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও চিকিৎসা
শিশুদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু জ্বর দ্রুত জটিল আকার ধারণ করতে পারে। অনেক সময় তারা নিজের সমস্যা স্পষ্টভাবে বলতে পারে না, ফলে অভিভাবকদের আরও বেশি সতর্ক থাকতে হয়। শিশুদের শরীরে পানিশূন্যতা খুব দ্রুত দেখা দিতে পারে এবং সময়মতো চিকিৎসা না হলে শকের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
শিশুদের ডেঙ্গু জ্বরের সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- হঠাৎ উচ্চমাত্রার জ্বর।
- শিশুর অস্বাভাবিক কান্না বা অস্থিরতা।
- খাওয়ার অনীহা।
- বমি হওয়া।
- বারবার ঘুমিয়ে পড়া বা অতিরিক্ত দুর্বলতা।
- শরীরে লালচে দাগ।
- হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া।
- প্রস্রাব কমে যাওয়া।
- পেটব্যথা।
অনেক শিশু প্রথমে শুধুমাত্র জ্বর নিয়ে অসুস্থ হয়। পরে ধীরে ধীরে অন্যান্য লক্ষণ দেখা দেয়। তাই দুই দিনের বেশি জ্বর থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শিশুদের চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ নিশ্চিত করা। শিশু যদি বুকের দুধ খায়, তাহলে আরও বেশি করে বুকের দুধ দিতে হবে। পাশাপাশি বয়স অনুযায়ী ওরস্যালাইন, স্যুপ, ডাবের পানি বা অন্যান্য তরল খাবার দেওয়া যেতে পারে।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য কোনো ওষুধ দেওয়া উচিত নয়। শিশুদের জ্বর কমানোর জন্য সাধারণত প্যারাসিটামল ব্যবহার করা হয়, তবে সেটিও অবশ্যই চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী দিতে হবে।
শিশুর যদি বারবার বমি হয়, প্রস্রাব কমে যায়, শ্বাসকষ্ট হয়, অতিরিক্ত ঘুমায় বা শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়, তাহলে দেরি না করে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। কারণ এগুলো ডেঙ্গুর জটিল পর্যায়ের লক্ষণ হতে পারে।
২য় বার ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ
অনেকের ধারণা একবার ডেঙ্গু হলে দ্বিতীয়বার আর হয় না। বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ভিন্ন ধরন (সেরোটাইপ) রয়েছে। এক ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর অন্য ধরনের ভাইরাসে আবারও আক্রান্ত হওয়া সম্ভব।
দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু হওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় রোগটি আগের তুলনায় বেশি জটিল হতে পারে। কারণ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তখন ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে, যার ফলে Severe Dengue হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুর সম্ভাব্য লক্ষণগুলো হলো—
- হঠাৎ উচ্চমাত্রার জ্বর
- তীব্র মাথাব্যথা
- শরীর ও হাড়ে প্রচণ্ড ব্যথা
- বমি বা বমি বমি ভাব
- পেটব্যথা
- শরীরে লালচে দাগ
- অতিরিক্ত দুর্বলতা
- নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া
- প্লেটলেট দ্রুত কমে যাওয়া
অনেক সময় দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর অবস্থা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই খারাপ হয়ে যেতে পারে। তাই যাদের আগে ডেঙ্গু হয়েছিল এবং আবার জ্বর এসেছে, তাদের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
রক্ত পরীক্ষা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং শরীরে পর্যাপ্ত তরল বজায় রাখা দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সতর্ক সংকেত দেখা দিলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার বিষয়ে দেরি করা উচিত নয়।
বড়দের ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও চিকিৎসা
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ ভাইরাল জ্বরের সঙ্গে মিল থাকে। তবে কয়েকটি নির্দিষ্ট উপসর্গ দেখা দিলে ডেঙ্গুর সন্দেহ করা উচিত।
বড়দের মধ্যে সাধারণত যেসব লক্ষণ বেশি দেখা যায় সেগুলো হলো—
- হঠাৎ উচ্চ জ্বর
- শরীর ও জয়েন্টে তীব্র ব্যথা
- চোখের পেছনে ব্যথা
- মাথাব্যথা
- ক্ষুধামন্দা
- বমি
- দুর্বলতা
- নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া
ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসায় কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। তাই চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা এবং শরীরের তরলের ভারসাম্য ঠিক রাখা।
বড়দের পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে এবং দিনে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ও অন্যান্য তরল পান করতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করাতে হবে। অনেকেই প্লেটলেট কমে যাওয়ার ভয়ে অযথা প্লেটলেট বাড়ানোর বিভিন্ন ঘরোয়া উপায় অনুসরণ করেন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে শুধু প্লেটলেটের সংখ্যা নয়, রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
যদি রোগীর শ্বাসকষ্ট হয়, রক্তচাপ কমে যায়, প্রস্রাব কম হয়, তীব্র পেটব্যথা শুরু হয় অথবা রক্তক্ষরণ দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া উচিত। সময়মতো চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ ডেঙ্গু রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন।
ডেঙ্গু জ্বরের ৭টি সতর্কীকরণ লক্ষণ
ডেঙ্গু জ্বরের ক্ষেত্রে একটি বিষয় সবসময় মনে রাখা জরুরি—জ্বর কমে গেলেই রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছেন, এমনটি ধরে নেওয়া যাবে না। অনেক সময় জ্বর কমার পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়। এ সময় শরীরে কিছু সতর্কীকরণ লক্ষণ (Warning Signs) দেখা দিতে পারে, যা অবহেলা করলে রোগীর অবস্থা দ্রুত সংকটাপন্ন হয়ে উঠতে পারে।
নিচে ডেঙ্গু জ্বরের ৭টি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কীকরণ লক্ষণ তুলে ধরা হলো—
১. তীব্র ও অবিরাম পেটব্যথা
সাধারণ ব্যথার তুলনায় যদি পেটে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হয় বা ব্যথা ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
২. বারবার বমি হওয়া
একাধিকবার বমি হলে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। এটি ডেঙ্গুর জটিল পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
৩. নাক, মাড়ি বা শরীরের অন্য অংশ থেকে রক্তক্ষরণ
নাক দিয়ে রক্ত পড়া, মাড়ি থেকে রক্ত বের হওয়া, বমির সঙ্গে রক্ত আসা কিংবা কালো রঙের পায়খানা হওয়া বিপজ্জনক লক্ষণ।
৪. অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব
রোগী যদি খুব দুর্বল হয়ে পড়েন, কথা বলতে অনীহা দেখান বা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ঘুমিয়ে থাকেন, তাহলে এটি উদ্বেগের বিষয়।
৫. শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
শ্বাসকষ্ট বা দ্রুত শ্বাস নেওয়া শরীরে তরল জমে যাওয়া বা অন্য জটিলতার ইঙ্গিত হতে পারে।
৬. প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া
দীর্ঘ সময় প্রস্রাব না হওয়া বা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম হওয়া শরীরে পানিশূন্যতার লক্ষণ হতে পারে।
৭. হাত–পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া বা রক্তচাপ কমে যাওয়া
এ ধরনের লক্ষণ ডেঙ্গু শকের (Dengue Shock Syndrome) পূর্বাভাস হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
এই সতর্কীকরণ লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি দেখা দিলেও দেরি না করে হাসপাতালে যোগাযোগ করা উচিত। সময়মতো চিকিৎসা শুরু হলে অধিকাংশ জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা
ডেঙ্গু জ্বরের নির্দিষ্ট কোনো ভাইরাসনাশক ওষুধ নেই। তাই চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য হলো রোগীর উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা, শরীরে পর্যাপ্ত তরল বজায় রাখা এবং জটিলতা প্রতিরোধ করা।
বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হলে রোগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে। পর্যাপ্ত পানি, ওরস্যালাইন, ডাবের পানি, লেবুর শরবত, স্যুপ ও অন্যান্য তরল খাবার বেশি করে খাওয়াতে হবে। এতে পানিশূন্যতার ঝুঁকি কমে।
জ্বর কমানোর জন্য সাধারণত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা হয়। তবে আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক, ন্যাপ্রোক্সেন বা অ্যাসপিরিনজাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া খাওয়া উচিত নয়। এসব ওষুধ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তের CBC, হেমাটোক্রিট, প্লেটলেট এবং অন্যান্য পরীক্ষা করতে বলতে পারেন। অনেকেই প্লেটলেট কমে গেলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কিন্তু শুধুমাত্র প্লেটলেটের সংখ্যা দেখে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। রোগীর রক্তচাপ, প্রস্রাবের পরিমাণ, শারীরিক অবস্থা এবং অন্যান্য লক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
যদি রোগীর শরীরে সতর্কীকরণ লক্ষণ দেখা দেয়, তবে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে শিরায় স্যালাইনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে হতে পারে। নিজে নিজে ওষুধ না খেয়ে অবশ্যই নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা উচিত।
আরও পড়ুন-কোমর ব্যথা সারানোর সহজ উপায় কি?
ডেঙ্গু জ্বরের রিপোর্ট
ডেঙ্গু নিশ্চিত করতে এবং রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করা হয়। রোগের কতদিন হয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে চিকিৎসক বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা দিতে পারেন।
NS1 Antigen Test:
জ্বর শুরু হওয়ার প্রথম ১ থেকে ৫ দিনের মধ্যে এই পরীক্ষা করলে ডেঙ্গু শনাক্ত করার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
CBC (Complete Blood Count):
এটি ডেঙ্গু রোগীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি। এর মাধ্যমে প্লেটলেট, শ্বেত রক্তকণিকা (WBC), হিমোগ্লোবিন এবং হেমাটোক্রিটের অবস্থা জানা যায়।
IgM ও IgG Antibody Test:
জ্বরের কয়েক দিন পর এই পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না তা জানা যায়।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শুধুমাত্র একটি রিপোর্ট দেখে আতঙ্কিত হওয়া উচিত নয়। একই রোগীর রিপোর্ট প্রতিদিন পরিবর্তিত হতে পারে। তাই রিপোর্টের পাশাপাশি রোগীর শারীরিক অবস্থাও মূল্যায়ন করা জরুরি।
শিশুদের ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা
শিশুদের ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিবিড় পর্যবেক্ষণ। কারণ অনেক সময় শিশুরা নিজের সমস্যা প্রকাশ করতে পারে না।
শিশুকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিতে হবে এবং বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত তরল খাবার খাওয়াতে হবে। বুকের দুধ পান করা শিশুদের ক্ষেত্রে আরও বেশি করে বুকের দুধ দিতে হবে। বড় শিশুদের ওরস্যালাইন, স্যুপ, ফলের রস বা অন্যান্য তরল দেওয়া যেতে পারে।
জ্বর নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে কোনোভাবেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য ব্যথানাশক ওষুধ দেওয়া উচিত নয়।
শিশুর যদি খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়, বারবার বমি হয়, প্রস্রাব কমে যায়, অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়ে বা শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
শিশুর চিকিৎসার ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদেরও সতর্ক থাকতে হবে। নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলো-আপ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয়
ডেঙ্গুর চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। কারণ এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করা গেলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে যেসব বিষয় মেনে চলা উচিত—
- বাসা ও আশপাশে কোথাও পরিষ্কার পানি জমতে দেবেন না।
- ফুলের টব, এসির ট্রে, ড্রাম, বালতি ও পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করুন।
- বাড়ির ছাদ, বারান্দা ও আঙিনা পরিষ্কার রাখুন।
- দিনে এডিস মশা বেশি কামড়ায়, তাই দিনের বেলায়ও মশারি ব্যবহার করা যেতে পারে।
- পুরো শরীর ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরুন।
- প্রয়োজনে মশা নিরোধক ক্রিম বা স্প্রে ব্যবহার করুন।
- জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং নিজের ইচ্ছামতো ওষুধ খাবেন না।
- পরিবার ও প্রতিবেশীদের নিয়ে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করুন।
ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং সামাজিক উদ্যোগ—দুইয়ের সমন্বয়েই ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব।
প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
ডেঙ্গু জ্বর হলে কিভাবে বুঝব?
যদি হঠাৎ উচ্চমাত্রার জ্বরের সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথা, শরীর ও জয়েন্টে ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, বমি বমি ভাব, শরীরে লালচে র্যাশ বা অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দেয়, তাহলে ডেঙ্গুর সম্ভাবনা থাকতে পারে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে হবে।
ডেঙ্গু জ্বরের প্রাথমিক চিকিৎসা কী?
প্রাথমিকভাবে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে, বেশি করে পানি ও তরল খাবার পান করতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল সেবন করতে হবে। সতর্কীকরণ লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
ডেঙ্গু রোগের ঔষধের নাম কি?
বর্তমানে ডেঙ্গু ভাইরাস ধ্বংস করার নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। চিকিৎসা মূলত উপসর্গভিত্তিক। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জ্বর নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন।
৩য় বার ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ কী কী?
তৃতীয়বার ডেঙ্গু হলেও লক্ষণ সাধারণত একই ধরনের হতে পারে,উচ্চ জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, বমি, দুর্বলতা, পেটব্যথা এবং রক্তক্ষরণ। যেহেতু একাধিকবার ডেঙ্গু হলে জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে, তাই দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
উপসংহার
ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। তবে সচেতনতা, সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ এবং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। তাই জ্বরকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে জ্বর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো এবং শরীরে পর্যাপ্ত তরল বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে এডিস মশার বিস্তার রোধে ভূমিকা রাখতে হবে। বাসাবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, কোথাও পরিষ্কার পানি জমতে না দেওয়া এবং মশার কামড় থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সচেতনতা বাড়লেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!