রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটক এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) নগদ বিক্রি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে—সম্প্রতি এমন নানা আলোচনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং প্রযুক্তি খাতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এসব গুঞ্জনের মধ্যেই সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি জানিয়েছেন, টেলিটক বিক্রির কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। বরং রাষ্ট্রায়ত্ত এই অপারেটরকে আধুনিক প্রযুক্তিতে উন্নীত করে আরও শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁও আইসিটি টাওয়ারে সেন্টার ফর টেকনোলজি জার্নালিজম (সিটিজে) আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রযুক্তি খাতের সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। এ সময় টেলিটক, নগদ, টেলিযোগাযোগ খাতের বিনিয়োগ এবং সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন মন্ত্রী।
ফকির মাহবুব আনাম বলেন, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে টেলিটক কিনতে অথবা এর অংশীদার হতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত এই মোবাইল অপারেটরকে বিক্রি করতে চায় না। সরকারের লক্ষ্য হলো টেলিটকের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন এবং বাজারে এটিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিয়ে যাওয়া।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের মোবাইল টেলিযোগাযোগ বাজারে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত অপারেটরের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই টেলিটককে বিক্রি না করে এর সেবার মান উন্নয়ন, গ্রাহকসেবা সম্প্রসারণ এবং আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে নতুনভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান ভিওন (VEON), যা বাংলালিংকের মূল কোম্পানি, সরকারের কাছে একটি প্রস্তাব জমা দেয়। ওই প্রস্তাবে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটক এবং বিটিসিএলের সঙ্গে অংশীদারিত্বে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে টেলিটককে বাংলালিংকের সঙ্গে একীভূত করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
এছাড়া ভিওন দেশের অন্যতম মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নগদে বিনিয়োগ অথবা অংশীদার হওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করে। বিষয়টি নিয়ে প্রযুক্তি খাত এবং আর্থিক খাতে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে স্পষ্ট করেছেন মন্ত্রী।
উল্লেখ্য, গত ২৯ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এক বৈঠকে ভিওনের চেয়ারম্যান অগি কে ফাবেলা বাংলাদেশে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেন। প্রস্তাব অনুযায়ী, এর মধ্যে ভিওন নিজস্বভাবে ২৫ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে এবং বাকি অর্থ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মতবিনিময় সভায় নগদের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, নগদকে ঘিরে বর্তমানে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। সেই মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সরকার এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে না।
তিনি আরও জানান, নগদ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া সমীচীন হবে না বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ একবার হাতছাড়া হয়ে গেলে তা উদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন। তাই আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, টেলিটক বর্তমানে বেসরকারি অপারেটরগুলোর তুলনায় গ্রাহকসংখ্যা এবং নেটওয়ার্ক সক্ষমতার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে থাকলেও দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে এর কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে সরকারি বিভিন্ন সেবা, জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট অনেক ক্ষেত্রে টেলিটকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে সরকারের পক্ষ থেকে টেলিটককে বিক্রি না করে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত অবকাঠামো এবং নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে আরও কার্যকর অপারেটরে পরিণত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে নগদের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নির্ভর করছে আদালতে চলমান মামলার ওপর। আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা, বিনিয়োগ কিংবা অংশীদারত্বের বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী।
প্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের এই বক্তব্যের ফলে টেলিটক বিক্রি নিয়ে চলমান নানা গুঞ্জনের অবসান হয়েছে। একই সঙ্গে নগদ সম্পর্কেও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। এখন নজর থাকবে টেলিটকের আধুনিকায়ন পরিকল্পনা কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং নগদের মামলার অগ্রগতির ওপর।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!