বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে শুরু করায় রোগ শনাক্তকরণ সহজ করতে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের সব সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগ নির্ণয়ের জন্য এনএস-১ (NS1) পরীক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। ফলে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য রোগীদের কোনো ফি দিতে হবে না।
রোববার (৫ জুলাই) স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা-১ শাখা থেকে এ সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। উপসচিব কাজী শরিফ উদ্দিন আহমেদের স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে দেশের সব সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে এনএস-১ পরীক্ষা চালু রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ডেঙ্গু রোগ দ্রুত শনাক্ত করার লক্ষ্যে সরকারি হাসপাতালগুলোতে এনএস-১ পরীক্ষা আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হবে। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ এবং নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য বলা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশনা দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক, সিভিল সার্জন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে রোগীরা যেন নির্বিঘ্নে এই সেবা পান, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু রোগের ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বরের প্রাথমিক পর্যায়ে এনএস-১ পরীক্ষা করলে রোগটি দ্রুত নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়। এতে রোগীর চিকিৎসা দ্রুত শুরু করা যায় এবং জটিলতা তৈরির ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসে। বিশেষ করে বর্ষাকালে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিনামূল্যে পরীক্ষার এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জন্য বড় স্বস্তি নিয়ে আসবে।
এনএস-১ বা নন-স্ট্রাকচারাল প্রোটিন-১ পরীক্ষা ডেঙ্গু শনাক্তকরণের অন্যতম কার্যকর পদ্ধতি। সাধারণত জ্বর শুরু হওয়ার প্রথম কয়েক দিনের মধ্যে এই পরীক্ষার মাধ্যমে ডেঙ্গু ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত করা যায়। এজন্য চিকিৎসকেরা সন্দেহভাজন রোগীদের দ্রুত এনএস-১ পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলতি বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা বিবেচনায় রেখেই পরীক্ষার সুবিধার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এর আগে গত ১৪ জুন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সম্মতি চেয়েছিল। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতির পর আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার প্রজনন বেড়ে যাওয়ায় প্রতিবছরই ডেঙ্গুর সংক্রমণ বৃদ্ধি পায়। তাই রোগ শনাক্তকরণ সহজ করা, আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা এবং মৃত্যুঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনামূল্যে পরীক্ষার সুযোগ থাকলেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। বাসাবাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পরিষ্কার পানি অপসারণ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং মশার কামড় থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার মতো বিষয়গুলোও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তারা আরও বলেন, জ্বর, শরীর ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, বমি ভাব কিংবা ত্বকে লালচে দাগ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এনএস-১ পরীক্ষা করিয়ে রোগ নিশ্চিত করা গেলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তে রাজধানীর পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালেও একই সুবিধা কার্যকর থাকবে। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয় ছাড়াই ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে পারবেন। স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ বাড়লে গুরুতর ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা এবং মৃত্যুঝুঁকি কমিয়ে আনা সহজ হবে।
বর্তমানে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে স্বাস্থ্য বিভাগ। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং রোগী ব্যবস্থাপনা জোরদার করারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও দ্রুত ও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়।
আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!