মার্কিন স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান স্টারলিংককে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আনফিল্টারড আইপি ট্রানজিট (Unfiltered IP Transit) সেবা দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত শুধু স্টারলিংকের কার্যক্রম সম্প্রসারণই নয়, বরং বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ইন্টারনেট ট্রানজিট হাব হিসেবে গড়ে তোলার পথও উন্মুক্ত করতে পারে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) স্টারলিংককে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অনুমতি দেয়। এর ফলে কোম্পানিটি বাংলাদেশের বিদ্যমান টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশগুলোর গ্রাহকদের জন্য আনফিল্টারড ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করতে পারবে।
তবে এই অনুমোদনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্তও নির্ধারণ করেছে সরকার। অনুমোদন অনুযায়ী, স্টারলিংকের এই আনফিল্টারড আইপি ট্রানজিট সেবা শুধুমাত্র বিদেশি বা প্রতিবেশী দেশের ব্যবহারকারীদের জন্য প্রযোজ্য হবে। বাংলাদেশের কোনো গ্রাহক এই আনফিল্টারড ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করতে পারবেন না। দেশের ভেতরে বিদ্যমান ইন্টারনেট ফিল্টারিং ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো আগের মতোই বহাল থাকবে।
বিটিআরসির ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশনস বিভাগের কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ইকবাল আহমেদ জানান, স্টারলিংকের আবেদন পাওয়ার অনেক আগেই কমিশন এ ধরনের নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু করেছিল। দীর্ঘ কারিগরি মূল্যায়ন শেষে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় এবং পরবর্তী অনুমোদনের ভিত্তিতেই এখন এটি বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসেছে।
তিনি বলেন, স্টারলিংক বাংলাদেশ থেকে আনফিল্টারড ব্যান্ডউইথ রপ্তানি করলে সরকারের কাছে নির্ধারিত কমিশন পরিশোধ করবে। এর ফলে দেশের জন্য একটি নতুন রাজস্ব উৎস তৈরি হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগও বাড়বে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ শুধু ইন্টারনেট ব্যবহারকারী দেশ হিসেবেই নয়, বরং আঞ্চলিক ডাটা ও ইন্টারনেট ট্রানজিট কেন্দ্র হিসেবেও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারবে। এর মাধ্যমে দেশের বিদ্যমান ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক, সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ এবং আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট অবকাঠামোর আরও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হবে।
এছাড়া দেশীয় ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি হবে। আন্তঃসীমান্ত ডাটা ট্রানজিট সেবায় অংশ নিয়ে তারা অতিরিক্ত আয় করতে পারবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে।
মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনপত্র অনুযায়ী, স্টারলিংক প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস পিএলসি থেকে ব্যান্ডউইথ সংগ্রহ করবে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির আওতায় এই ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করা হবে।
তবে বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস প্রয়োজনীয় ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে বিকল্প হিসেবে সামিট কমিউনিকেশন লিমিটেড এবং ফাইবার@হোম লিমিটেড থেকে ব্যান্ডউইথ সংগ্রহের সুযোগও রাখা হয়েছে। এর ফলে সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যদিও নতুন এই অনুমোদন স্টারলিংকের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে, একই সময়ে কোম্পানিটি বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস থেকে ব্যান্ডউইথ কেনার পরিমাণ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিটির কাছ থেকে ২০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করলেও আগামী ৩১ জুলাই থেকে সেটি কমিয়ে ১০০ জিবিপিএস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মূল কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। কারণ কোম্পানিটি নিজেদের নেটওয়ার্ক কাঠামো ও বিকল্প সংযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যান্ডউইথ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনছে।
বাংলাদেশে স্টারলিংকের কার্যক্রমও ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কাছ থেকে নন-জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট অরবিট (NGSO) সেবা পরিচালনার লাইসেন্স পাওয়ার পর একই বছরের ৮ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটি দেশে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে।
বর্তমানে কালিয়াকৈর, যশোর এবং রাজশাহীতে স্টারলিংকের আর্থ স্টেশন রয়েছে। পাশাপাশি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে একটি পয়েন্ট অব প্রেজেন্স (PoP) স্থাপন করা হয়েছে, যেখান থেকে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ে অপারেটরদের মাধ্যমে ব্যান্ডউইথ গ্রহণ করা হচ্ছে।
স্টারলিংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে তাদের সক্রিয় গ্রাহক সংখ্যা ৩ হাজার ৯৩১ জন। উচ্চগতির স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের চাহিদা বাড়তে থাকায় এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আনফিল্টারড আইপি ট্রানজিট সেবা চালুর অনুমতির জন্য স্টারলিংক গত বছরের ১৩ আগস্ট বিটিআরসিতে আনুষ্ঠানিক আবেদন করে। পরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চায়। ২৭ আগস্ট দেওয়া জবাবে কোম্পানিটি জানায়, এই সেবা শুধুমাত্র প্রতিবেশী দেশগুলোর গ্রাহকদের জন্য ব্যবহার করা হবে এবং বাংলাদেশের কোনো ব্যবহারকারী এর আওতায় থাকবেন না।
বিটিআরসি জানিয়েছে, এ ধরনের সেবা বাংলাদেশে একেবারে নতুন নয়। এর আগে ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস বিভিন্ন সময়ে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান বিএসএনএলকে ১০ থেকে ২০ জিবিপিএস আনফিল্টারড আইপি ট্রানজিট ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করেছিল। তবে পরবর্তীতে বিএসএনএল তাদের অবশিষ্ট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, স্টারলিংকের নতুন এই অনুমোদন বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে। সফলভাবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্রানজিট বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং দেশীয় টেলিযোগাযোগ খাতের নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!