দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা, বাজারে ভেজালবিরোধী অভিযান আরও কার্যকর করা এবং এ কাজে নিয়োজিত সরকারি সংস্থাগুলোর দীর্ঘদিনের সমস্যা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নতুন এই কমিটিকে এক মাসের মধ্যে মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের সুপারিশসহ পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

সোমবার (৬ জুলাই) বিকেলে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। সভায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), সিটি করপোরেশন এবং মাঠপর্যায়ে ভেজালবিরোধী অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনিকে সদস্য করে তিন সদস্যের এই উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হবে। কমিটিকে আগামী এক মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান সমস্যা, সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে সুপারিশ প্রণয়ন করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

সভায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে এবং ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনায় তারা নানা ধরনের বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক এলাকায় সীমিত জনবল নিয়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করতে হচ্ছে, ফলে কার্যক্রমের গতি ব্যাহত হচ্ছে।

কর্মকর্তারা আরও জানান, আধুনিক পরীক্ষাগারের অভাবও বড় একটি চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহভাজন খাদ্যপণ্য দ্রুত পরীক্ষা করার সুযোগ না থাকায় আইনি কার্যক্রম বিলম্বিত হয়। তাই বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা তারা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন।

সভায় মাঠপর্যায়ে অভিযান পরিচালনার জন্য উন্নত প্রযুক্তির সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা গেলে খাদ্যের মান দ্রুত পরীক্ষা করা এবং ভেজাল শনাক্ত করা অনেক সহজ হবে। এতে অভিযান আরও কার্যকর হবে এবং আইনি প্রক্রিয়াও দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

আলোচনায় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও উঠে আসে। কর্মকর্তারা জানান, অনেক সময় ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের চাপ ও ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়। তাই নিরাপদভাবে দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানান তারা।

একই সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার প্রস্তাবও সভায় উত্থাপন করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন, আইনি ক্ষমতা এবং প্রশাসনিক সহায়তা আরও বাড়ানো হলে ভেজাল উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

সভায় কর্মকর্তাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনার পর প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমস্যাকে অজুহাত হিসেবে দেখলে চলবে না। বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই কাজ এগিয়ে নিতে হবে এবং একই সঙ্গে সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তিনি সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে বলেন, দেশের স্বার্থে সবাইকে আরও দায়িত্বশীল, আন্তরিক এবং সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের অনেক দেশ একসময় বাংলাদেশের চেয়েও অনুন্নত ছিল। কিন্তু পরিকল্পিত উদ্যোগ, সুশাসন এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে তারা উন্নতির পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশকেও একইভাবে এগিয়ে যেতে হলে প্রতিটি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের সচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জনগণ সচেতন না হলে শুধু আইন প্রয়োগ করে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না।

জনসচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী রাজধানীর গুলশান লেকের উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন লেক ও জলাশয়ে প্রতিনিয়ত আবর্জনা ফেলা হচ্ছে এবং দুঃখজনক বিষয় হলো, অনেক শিক্ষিত মানুষও এ ধরনের দায়িত্বহীন আচরণ করছেন। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় নাগরিকদের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তার মতে, দেশের উন্নয়ন শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর করে না। নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণ, আইন মেনে চলার মানসিকতা এবং সামাজিক সচেতনতা থাকলে অনেক সমস্যার সমাধান সহজ হয়ে যায়। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতেও সরকারি সংস্থার পাশাপাশি ব্যবসায়ী, উৎপাদক এবং ভোক্তা—সব পক্ষকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে।

সভায় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আব্দুস সাত্তার, বাণিজ্য সচিব আতাউর রহমান খান, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ এবং ভেজালবিরোধী কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উচ্চপর্যায়ের এই কমিটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকর সুপারিশ দিতে পারলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ এবং ভেজালবিরোধী অভিযানে নতুন গতি আসবে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘদিনের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত সমস্যারও বাস্তবসম্মত সমাধান পাওয়ার পথ তৈরি হতে পারে।

সূত্র: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!