মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। পরিবার, আত্মীয়-স্বজনের পাশাপাশি একজন মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কগুলোর একটি হলো প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক। ইসলাম শুধু ইবাদতের ওপর নয়, বরং মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। বিশেষ করে প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা ও তার সঙ্গে সদাচরণের বিষয়ে কোরআন-হাদিসে বারবার নির্দেশনা এসেছে।
অন্যদিকে, প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া, তার অধিকার নষ্ট করা বা তার অনিষ্ট করা ইসলামে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। হাদিসে এমন ব্যক্তির জন্য কঠোর সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচারের নির্দেশ
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন,
“তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না এবং সদ্ব্যবহার করো মাতা-পিতা, আত্মীয়স্বজন, এতিম, মিসকিন, নিকটবর্তী প্রতিবেশী, দূরবর্তী প্রতিবেশী, সঙ্গী, মুসাফির ও তোমাদের অধীনস্থদের সঙ্গে। নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারী ও দাম্ভিক ব্যক্তিকে পছন্দ করেন না।”
(সুরা নিসা, আয়াত: ৩৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন,
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে সম্মান করে।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৯)
প্রতিবেশীকে কষ্ট দিলে কী ক্ষতি হয়?
১. পূর্ণ ঈমানের পরিপন্থী
প্রতিবেশীর অনিষ্ট করে কেউ পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারে না।
রাসুল (সা.) বলেছেন,
“আল্লাহর শপথ! সে মুমিন নয়… যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৬)
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে ঈমান অস্বীকার নয়; বরং পরিপূর্ণ ঈমানের অভাব বোঝানো হয়েছে।
২. জান্নাতে প্রবেশের কঠোর সতর্কবার্তা
প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়ার ব্যাপারে রাসুল (সা.) অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন।
তিনি বলেছেন,
“যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৬)
৩. প্রতিবেশীর অধিকার লঙ্ঘন বড় গুনাহ
ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, তার সম্মানহানি বা পরিবারের ক্ষতি করা অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) প্রতিবেশীর পরিবারের প্রতি অন্যায়ের ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন।
(মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২৩৩৪২)
৪. মানুষের অভিশাপের কারণ
এক ব্যক্তি প্রতিবেশীর অত্যাচারের অভিযোগ নিয়ে রাসুল (সা.)-এর কাছে গেলে তিনি ধৈর্য ধরতে বলেন। পরে তাকে ঘরের জিনিসপত্র বাইরে রাখতে নির্দেশ দেন। মানুষ বিষয়টি জেনে অত্যাচারী প্রতিবেশীকে অভিশাপ দিতে থাকে। তখন সে নিজের ভুল বুঝে ক্ষমা চায় এবং ভবিষ্যতে আর কষ্ট না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫১৫৩)
৫. বেশি ইবাদতও উপকারে নাও আসতে পারে
শুধু বেশি নামাজ, রোজা বা নফল ইবাদত করলেই চলবে না; মানুষের হক আদায় করাও জরুরি।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, এক নারীর অনেক নামাজ-রোজা ও সদকার কথা বলা হলেও তিনি প্রতিবেশীদের কষ্ট দিতেন। রাসুল (সা.) বলেন, তিনি জাহান্নামি।
অন্যদিকে আরেক নারীর ইবাদত তুলনামূলক কম হলেও তিনি কাউকে কষ্ট দিতেন না। রাসুল (সা.) বলেন, তিনি জান্নাতি।
(মিশকাতুল মাসাবিহ)
একজন ভালো প্রতিবেশীর বৈশিষ্ট্য
ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী একজন উত্তম প্রতিবেশী—
১. প্রতিবেশীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।
২. কষ্টদায়ক আচরণ থেকে বিরত থাকেন।
৩. বিপদে পাশে দাঁড়ান।
৪. ঝগড়া-বিবাদ এড়িয়ে চলেন।
৫. সম্মান ও সৌহার্দ্য বজায় রাখেন।
৬. মুখ ও আচরণ দিয়ে কাউকে আঘাত করেন না।
ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নামাজ, রোজা ও অন্যান্য ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের হক আদায় করাও ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই একজন মুসলমানের উচিত প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ করা, তার অধিকার রক্ষা করা এবং এমন কোনো কাজ না করা, যাতে তিনি কষ্ট পান।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!