ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস—যাকে বিশ্বের অন্যতম ‘ভালোবাসার শহর’ বলা হয়। এই শহরের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীক আইফেল টাওয়ার। বছরের পর বছর ধরে লাখো পর্যটকের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকা এই স্থাপনাটি এবার আলোচনায় এসেছে ভিন্ন এক কারণে। চলমান সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের ফলে টাওয়ারটির কিছু অংশে রঙ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এতে বাইরের আবরণ ছাড়াই দৃশ্যমান হয়েছে এর বিশাল লোহার কাঠামো, যাকে অনেকেই ‘লৌহকঙ্কাল’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন।

এই ব্যতিক্রমী দৃশ্য ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। অনেক পর্যটক বলছেন, রঙের আবরণ ছাড়া আইফেল টাওয়ারের প্রকৃত ধাতব কাঠামো কাছ থেকে দেখার সুযোগ সচরাচর মেলে না। তাই সংস্কারের এই সময়টিও তাঁদের কাছে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে।

ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখতে নির্দিষ্ট সময় পরপর এর রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। পুরোনো রঙ তুলে নতুন প্রতিরক্ষামূলক আবরণ দেওয়া হয়, যাতে লোহার কাঠামো মরিচা থেকে সুরক্ষিত থাকে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নিয়মিত সংস্কারই আইফেল টাওয়ারের সৌন্দর্য ও স্থায়িত্ব ধরে রাখার অন্যতম কারণ।

১৮৮৯ সালে নির্মিত হওয়ার পর আইফেল টাওয়ার বিশ্বের সর্বোচ্চ মানবসৃষ্ট স্থাপনার মর্যাদা অর্জন করেছিল। প্রায় ৪১ বছর ধরে এটি সেই গৌরব ধরে রাখে। তবে সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং আকাশছোঁয়া ভবন নির্মাণের প্রতিযোগিতায় সেই অবস্থান অনেক আগেই বদলে গেছে।

বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবনের তালিকায় আইফেল টাওয়ারের নাম নেই। আধুনিক প্রকৌশল প্রযুক্তির ফলে বিভিন্ন দেশে একের পর এক সুউচ্চ ভবন নির্মিত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন হলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের বুর্জ খলিফা, যার উচ্চতা প্রায় ২ হাজার ৭১৭ ফুট। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন উচ্চ ভবন নির্মাণকে শুধু স্থাপত্য নয়, বরং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও জাতীয় মর্যাদার প্রতীক হিসেবেও বিবেচনা করছে।

তবে শুধু আইফেল টাওয়ারই নয়, এর আশপাশেও রয়েছে পর্যটকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ। টাওয়ারের পাশের সবুজ বাগানের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে ‘শান্তির দেয়াল’ (Wall for Peace) নামে একটি অনন্য স্মৃতিস্তম্ভ। জেরুজালেমের বিখ্যাত ‘কান্নার দেয়াল’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে শিল্পী ক্লারা হ্যাল্টার এবং স্থপতি জিন মাইকেল উইলমোট এটি নির্মাণ করেন।

বিশ্বে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে নির্মিত এই স্মৃতিস্তম্ভটির দৈর্ঘ্য ১৬ দশমিক ৪ মিটার, প্রস্থ ১৩ দশমিক ৮ মিটার এবং উচ্চতা ৯ মিটার। কাঠ ও কাচ দিয়ে তৈরি এই দেয়ালে বিশ্বের ৪৯টি ভাষায় লেখা রয়েছে ‘শান্তি’ শব্দটি। দেয়ালটির চারপাশে স্থাপন করা ৩২টি লোহার দণ্ড বিশ্বমানবতার ঐক্য ও সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০০০ সালে ফ্রান্সের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাক এই স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধন করেন।

সংস্কারকাজ চললেও আইফেল টাওয়ার দর্শনার্থীদের জন্য পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ধাপে ধাপে কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে, যাতে পর্যটকদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় বড় ধরনের বিঘ্ন না ঘটে।

বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় এই স্থাপনাটি শুধু ফ্রান্সের নয়, পুরো বিশ্বের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। নতুন রঙ ও সংস্কার শেষে আইফেল টাওয়ার আবারও আগের মতোই তার চিরচেনা সৌন্দর্যে দর্শনার্থীদের স্বাগত জানাবে—এমনটাই আশা সংশ্লিষ্টদের।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!