ভারতের বাজারে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। দেশটির বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ট্রেড রেমেডিজ (DGTR) বিদ্যমান অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক বহাল রেখে প্রতিষ্ঠানভেদে নতুন শুল্কহার নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। এই সুপারিশ কার্যকর হলে বিশেষ করে তালিকার বাইরে থাকা বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য ভারতীয় বাজারে টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ২৫ জুন প্রকাশিত ৯৮ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা পাট সুতা, হেসিয়ান কাপড়, পাটের বস্তা এবং বাংলাদেশের স্যাকিং ক্লথের ওপর আরোপিত অ্যান্টিডাম্পিং শুল্কের মধ্যবর্তী পর্যালোচনার ফল প্রকাশ করা হয়। এখন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করলেই নতুন শুল্কহার কার্যকর হবে।

কী পরিবর্তন আসছে?

ভারতের সুপারিশ অনুযায়ী, ২০১৭ সালে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্কের আওতায় থাকা ৫৫টি প্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকা রপ্তানিকারকদের ওপর তুলনামূলক বেশি শুল্ক আরোপ করা হতে পারে।

এতে বড় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারকেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে—

১. ওয়াহাব জুট মিলসের পাট সুতার ওপর প্রতি টনে ৬৯ মার্কিন ডলার শুল্কের সুপারিশ করা হয়েছে।

২. অথচ তালিকার বাইরে থাকা অন্য প্রতিষ্ঠানের একই পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৪৫ মার্কিন ডলার।

৩. হেসিয়ান কাপড়ের ক্ষেত্রেও তালিকার বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রতি টনে ৮৮ ডলার শুল্কের সুপারিশ করা হয়েছে।

চার প্রতিষ্ঠানের জন্য স্বস্তি

অন্যদিকে চারটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক শূন্য করার সুপারিশ করেছে ডিজিটিআর। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—

১. জনতা জুট মিলস

২. ন্যাশনাল জুট ম্যানুফ্যাকচারিং করপোরেশন

৩. আলহাজ জুট মিলস

৪. সাদাত জুট ইন্ডাস্ট্রিজ

তবে এই সিদ্ধান্তকে খাতসংশ্লিষ্ট অনেকেই বিস্ময়কর বলে মন্তব্য করেছেন।

সরকারের অবস্থান

বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে আলোচনা করা হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এমন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার অনুরোধ জানানো হবে, যা দুই দেশের বাণিজ্যে নতুন বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ

বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) সভাপতি তাপস প্রামাণিক বলেন, ভারতের অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক দীর্ঘদিন ধরেই দেশের পাটশিল্পের জন্য বড় বাধা হয়ে আছে।

তার ভাষায়, বর্তমানে অনেক রপ্তানিকারক ভারতীয় বাজারকে প্রায় হিসাবের বাইরে রেখেই ব্যবসায়িক পরিকল্পনা করছেন। সরকারের কূটনৈতিক ও আইনি উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন হবে।

ভারতের অভিযোগ কী?

ভারতের দাবি, বাংলাদেশ থেকে কম দামে পাটপণ্য রপ্তানি হওয়ায় দেশটির স্থানীয় পাটশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—

১. ২০২০-২১ সময়ের তুলনায় বাংলাদেশি হেসিয়ান কাপড়ের গড় রপ্তানিমূল্য ৭ শতাংশ কমেছে।

২. পাট সুতার গড় রপ্তানিমূল্য কমেছে ১২ শতাংশ।

৩. একই সময়ে ভারতে বাংলাদেশের পাটপণ্যের রপ্তানিও বেড়েছে।

তবে বাংলাদেশ সরকার ও রপ্তানিকারকদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজার, ডলারের বিনিময় হার, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কারণেই দামে পরিবর্তন এসেছে। এটিকে ডাম্পিং হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

অর্থনীতিবিদদের মত

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের বাস্তবতায় উৎপাদন খরচের নিচে দামে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান পাটপণ্য রপ্তানি করছে—এমনটি বিশ্বাসযোগ্য নয়।

তিনি আরও বলেন, প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO)-এর মাধ্যমে বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করার উদ্যোগ নিতে পারে। অতীতে রহিমআফরোজের ব্যাটারির ওপর ভারতের অ্যান্টিডাম্পিং শুল্কও এভাবেই প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

পাট খাতের জন্য কী প্রভাব পড়তে পারে?

ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বড় পাটপণ্যের বাজার। নতুন শুল্ক কার্যকর হলে—

১. রপ্তানি ব্যয় বাড়বে

২. ভারতীয় বাজারে প্রতিযোগিতা কমবে

৩. ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে

৪. পাটকল, কৃষক ও শ্রমিকদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে

৫. বৈদেশিক মুদ্রা আয়েও চাপ তৈরি হতে পারে

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এখনই সরকারকে কূটনৈতিক, আইনি এবং বাণিজ্যিক উদ্যোগ জোরদার করতে হবে, যাতে বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী রপ্তানি খাত নতুন সংকটে না পড়ে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!