ফুটবল যদি শিল্প হয়, তবে সেই শিল্পের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কারিগর লিওনেল মেসি। আর ফুটবল যদি একটি মহাকাব্য হয়, তাহলে তার সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর কেন্দ্রে রয়েছেন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা। গোল, ট্রফি ও রেকর্ডের গণ্ডি পেরিয়ে মেসি আজ কোটি মানুষের আবেগ, অনুপ্রেরণা এবং ফুটবল সৌন্দর্যের প্রতীক। সেই কিংবদন্তি ফুটবলারের আজ ৩৯তম জন্মদিন।

১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে জন্ম নেওয়া মেসির শৈশব ছিল সংগ্রামে ভরা। অল্প বয়সেই তাঁর শরীরে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি ধরা পড়ে। ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ বহন করা পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে। ঠিক তখনই তাঁর পাশে দাঁড়ায় স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা।

ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত গল্পগুলোর একটি হলো ‘ন্যাপকিন চুক্তি’। প্রচলিত সেই গল্প অনুযায়ী, একটি ন্যাপকিন কাগজে মেসিকে দলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বার্সেলোনা। এরপর পরিবারসহ স্পেনে পাড়ি জমান কিশোর মেসি, আর সেখান থেকেই শুরু হয় বিশ্ব ফুটবলের এক নতুন অধ্যায়।

লা মাসিয়া একাডেমিতে নিজের প্রতিভার ঝলক দেখানোর পর ২০০৪ সালে বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেক হয় তাঁর। এরপর প্রায় দুই দশক ধরে ক্লাব ফুটবলে রাজত্ব করেছেন তিনি। জাভি হার্নান্দেজ ও আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার সঙ্গে গড়ে তুলেছিলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা বার্সেলোনা দল।

বার্সেলোনার জার্সিতে অসংখ্য শিরোপা জয়ের পাশাপাশি ক্লাবটির ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হয়েছেন মেসি। তাঁর ক্ষিপ্র ড্রিবলিং, নিখুঁত পাস, দুর্দান্ত ফিনিশিং এবং ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়।

ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকেও মেসির ক্যারিয়ার ঈর্ষণীয়। রেকর্ড ৮টি ব্যালন ডি’অর, একাধিক ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু, ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতিসহ অসংখ্য পুরস্কার তাঁর ঝুলিতে।

তবে দীর্ঘ সময় ধরে জাতীয় দলের হয়ে বড় কোনো শিরোপা না জেতার আক্ষেপ ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে হার, কোপা আমেরিকার একের পর এক ফাইনালে পরাজয় এবং সমালোচনার মুখে একসময় জাতীয় দল ছাড়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু গল্পের সমাপ্তি হয়নি সেখানে। ২০২১ সালে আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকা জিতিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটান মেসি। এরপর ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে অধিনায়ক হিসেবে দলকে শিরোপা এনে পূরণ করেন নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।

বিশ্বকাপ জয় শুধু একটি ট্রফি অর্জন ছিল না, বরং ফুটবল ইতিহাসে তাঁর অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে। অনেকের মতে, ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলোর একটি হলো মেসির বিশ্বকাপ জয়ের যাত্রা।

৩৯ বছরে পা রাখলেও এখনো থামার কোনো লক্ষণ নেই তাঁর মধ্যে। চলমান বিশ্বকাপেও দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। জন্মদিনের আগের ম্যাচে জোড়া গোল করেছেন, তার আগে করেছিলেন হ্যাটট্রিক। তাঁর নেতৃত্বে ইতোমধ্যেই নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে আর্জেন্টিনা।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করে যাওয়া এই মহাতারকা এখনো মাঠে নামলেই নতুন কিছু দেখার প্রত্যাশা থাকে সমর্থকদের। বয়স বাড়লেও কমেনি তাঁর প্রভাব, ফুরিয়ে যায়নি জাদু।

রোজারিওর সেই ছোট্ট ছেলেটি আজ বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল নামগুলোর একটি। তাই মেসির জন্মদিন শুধু একজন ফুটবলারের জন্মদিন নয়, এটি ফুটবল ইতিহাসের এক সোনালি অধ্যায়ের উদযাপন।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!