বিকেলের শেষ আলোটা জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকছে। শহরের একটি বড় হাসপাতালের কেবিনে শুয়ে আছে সফল ব্যবসায়ী আরিফ রহমান। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। চারদিকে আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্র, দামি মোবাইল, ফলের ঝুড়ি—সবই আছে। শুধু একজন মানুষ নেই, যাকে সে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনের সময় পাশে চেয়েছিল।

তার মা।

কিন্তু মা আর এই পৃথিবীতে নেই।

হাসপাতালের সাদা ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ আরিফের চোখ ভিজে উঠল। বহু বছর আগের কথা মনে পড়ে গেল।

আরিফ তখন ছোট। গ্রামের একটি ভাঙাচোরা টিনের ঘরে তাদের সংসার। বাবা মারা গেছেন সে যখন মাত্র পাঁচ বছরের শিশু। সংসারের সব দায়িত্ব এসে পড়ে তার মা রোকেয়া বেগমের কাঁধে।

সকালে অন্যের বাড়িতে কাজ, দুপুরে সেলাই, রাতে মোমবাতির আলোয় কাপড় সেলাই—এভাবেই চলত জীবন।

একদিন স্কুল থেকে ফিরে আরিফ দেখল, তার সহপাঠীদের প্রায় সবার নতুন জুতা হয়েছে। শুধু তার পায়ে ছেঁড়া স্যান্ডেল।

সে রাগ করে মাকে বলেছিল,

—”আমি কাল স্কুলে যাব না। সবাই হাসে।”

রোকেয়া বেগম ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন,

—”আর একদিন ধৈর্য ধর বাবা।”

সেদিন রাতে মা নিজে ভাত খাননি।

পরদিন সকালে আরিফের জন্য নতুন একজোড়া জুতা এনে দিলেন।

অনেক বছর পর আরিফ জানতে পেরেছিল, সেই জুতা কিনতে মা নিজের একমাত্র সোনার নাকফুল বিক্রি করেছিলেন।

সময় গড়াতে থাকে।

আরিফ লেখাপড়ায় ভালো ফল করতে শুরু করে। কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায় শহরে।

ভর্তি ফি জমা দেওয়ার শেষ দিন।

কিন্তু টাকা নেই।

সেদিন গভীর রাতে আরিফ ঘুম ভেঙে দেখে, তার মা ঘরের এক কোণে বসে কাঁদছেন।

পরদিন সকালে মা হাসিমুখে টাকা এগিয়ে দিলেন।

—”যা বাবা, ভর্তি হয়ে আয়।”

বহু বছর পরে আরিফ জানতে পারে, সেই টাকা জোগাড় করতে মা তাদের শেষ সম্বল ছোট্ট জমিটুকুও বিক্রি করেছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে আরিফ চাকরি পায়।

তারপর ব্যবসা শুরু করে।

ধীরে ধীরে সফল হতে থাকে।

বড় বাড়ি, দামি গাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ—সবকিছুই আসে জীবনে।

শুধু সময়টা আর থাকে না।

মায়ের জন্য।

মা ফোন দিতেন।

—”বাবা, কবে আসবি?”

—”মা, খুব ব্যস্ত আছি। পরে কথা বলব।”

মা অপেক্ষা করতেন।

আরিফ ভাবত, পরে একদিন সময় নিয়ে মায়ের কাছে যাবে।

কিন্তু সেই “পরে” আর আসত না।

একদিন গভীর রাতে ফোন এল গ্রামের বাড়ি থেকে।

মায়ের অবস্থা ভালো না।

আরিফ ছুটে গেল।

কিন্তু পৌঁছাতে পৌঁছাতে সব শেষ।

সাদা কাফনে মোড়ানো মায়ের মুখ দেখে সে ভেঙে পড়ল।

কাঁপা হাতে মায়ের কপালে চুমু দিয়ে বলেছিল,

—”মা, আমি চলে এসেছি।”

কিন্তু এবার কোনো উত্তর আসেনি।

মায়ের জিনিসপত্র গুছাতে গিয়ে একটি পুরোনো ডায়েরি খুঁজে পেল আরিফ।

ডায়েরির পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে।

এক জায়গায় লেখা—

“আজ আরিফ ফোন করেছিল। খুব ব্যস্ত। তবু তার কণ্ঠ শুনে মন ভরে গেছে।”

আরেক জায়গায় লেখা—

“আজ আমার খুব জ্বর। আরিফকে বলিনি। ছেলেটা চিন্তা করবে।”

আরও একটি পাতায় লেখা—

“আল্লাহ, আমার ছেলেটাকে ভালো রেখো। আমার জন্য কিছু চাই না।”

আরিফ ডায়েরি বুকে চেপে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে।

সে বুঝতে পারে, পৃথিবীতে এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি নিজের সব সুখ, সব স্বপ্ন, সব প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে শুধু তার সুখ চেয়েছেন।

মায়ের মৃত্যুর এক বছর পর।

আরিফ গ্রামের সেই স্কুলে যায়, যেখানে তার শৈশব কেটেছে।

সে মায়ের নামে একটি বৃত্তি চালু করে।

গরিব শিক্ষার্থীদের জন্য বই, পোশাক আর শিক্ষার ব্যবস্থা করে।

অনুষ্ঠানের শেষে স্কুলের এক ছোট্ট মেয়ে এসে জিজ্ঞেস করে,

—”চাচা, আপনি এত কিছু করছেন কেন?”

আরিফ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।

তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে,

—”কারণ আমার মা আমাকে শিখিয়েছিলেন, ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া নয়, অন্যের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া।”

সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ মনে হলো, পাশে কেউ যেন হাঁটছে।

সেই চেনা মুখ।

সেই মমতাভরা চোখ।

সেই মানুষ, যিনি জীবনের প্রতিটি ঝড়ে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

আরিফের চোখ ভিজে উঠল।

মনের ভেতর থেকে শুধু একটি কথাই বারবার বেরিয়ে আসতে লাগল—

“মা, তুমি কি একটু বসবে? তোমার সঙ্গে আমার অনেক কথা ছিল…”

কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে কষ্টের সত্য হলো—

অনেক সময় আমরা মায়ের মূল্য বুঝি তখনই, যখন তাঁকে আর ছুঁয়ে দেখা যায় না।

আর তাই পৃথিবীর প্রতিটি সন্তানের জন্য একটাই অনুরোধ—

মা বেঁচে থাকতে তাঁকে সময় দিন, ভালোবাসুন, জড়িয়ে ধরুন। কারণ মায়ের মতো নিঃস্বার্থ মানুষ জীবনে দ্বিতীয়জন আর কখনও আসে না।

গল্পের শিক্ষা:
মায়ের ভালোবাসা নিঃস্বার্থ, শর্তহীন এবং অমূল্য। জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও বাবা-মায়ের জন্য সময় বের করা উচিত, কারণ হারিয়ে যাওয়ার পর কোনো অনুশোচনাই তাদের ফিরিয়ে আনতে পারে না।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!