২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কাঁচা কাজুবাদাম আমদানির ওপর শুল্ক ও ভ্যাট বাড়ানোর প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের উদ্যোক্তারা। তাদের আশঙ্কা, নতুন শুল্ক কাঠামো কার্যকর হলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাজুবাদামের তুলনায় আমদানিকৃত প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম বাজারে অনেক কম দামে বিক্রি হবে। এতে দেশীয় শিল্প প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না এবং একাধিক কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রস্তাবিত বাজেটে এমন একটি শুল্ক কাঠামো রাখা হয়েছে, যেখানে স্থানীয় কারখানার কাঁচামাল আমদানির ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু ভারত থেকে আসা প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম সাউথ এশিয়ান ফ্রি ট্রেড এরিয়া (সাফটা) চুক্তির সুবিধার কারণে আগের মতোই তুলনামূলক কম শুল্কে বাজারে প্রবেশ করতে পারবে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশে উৎপাদিত কাজুবাদামের পরিমাণ এখনো চাহিদার তুলনায় অনেক কম। ফলে স্থানীয় কারখানাগুলোকে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে কাঁচা কাজুবাদাম আমদানি করতে হয়। কিন্তু নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী খোসাসহ কাঁচা কাজুবাদাম আমদানিতে ১৫ শতাংশ কাস্টমস শুল্ক ও ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এতে কাঁচামাল আমদানির মোট করের হার ১৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ দশমিক ৩৮ শতাংশে পৌঁছাবে।
খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, নতুন শুল্ক কাঠামো কার্যকর হলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত প্রতি কেজি প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের উৎপাদন খরচ দাঁড়াবে প্রায় ১ হাজার ৭২৫ টাকা। অন্যদিকে ভারত থেকে আমদানিকৃত একই পণ্যের বাজারমূল্য হতে পারে প্রায় ১ হাজার ২৮২ টাকা। ফলে প্রতি কেজিতে প্রায় ৪৭১ টাকার মূল্য ব্যবধান তৈরি হবে।
গ্রিন হার্ভেস্ট ফ্রেশ প্রডিউস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রবিউল ইসলাম আজাদ বলেন, বর্তমান প্রস্তাব বহাল থাকলে স্থানীয় কারখানাগুলোর পক্ষে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ আমদানিকারকেরা দেশীয় উৎপাদন ব্যয়ের চেয়েও কম দামে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন।
তিনি বলেন, দেশের চাহিদা পূরণে এখনো আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ কাঁচা কাজুবাদাম আমদানি করতে হয়। এসব দেশ সাফটা চুক্তির আওতায় না থাকায় পুরো শুল্ক দিতে হয়। কিন্তু ভারত থেকে প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম আমদানিতে বিশেষ সুবিধা বহাল রয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, দেশীয় কৃষকদের সুরক্ষা দিতে এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাজুবাদামের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে উদ্যোক্তাদের দাবি, বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ২ হাজার টন কাঁচা কাজুবাদাম উৎপাদিত হলেও চাহিদা রয়েছে ১৫ হাজার টনের বেশি। দেশে বছরে প্রায় ৩ হাজার টন প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম ব্যবহার হয়, যার মধ্যে স্থানীয় উৎপাদন মাত্র ৮০০ টন। বাকি অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়।
বিএসআরএম গ্রুপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেন, বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখতেই প্রতিবছর ৪ হাজার টনের বেশি কাঁচা কাজুবাদাম প্রয়োজন হয়। দেশীয় উৎপাদন সেই চাহিদার অর্ধেকও পূরণ করতে পারে না। ফলে আমদানি ছাড়া শিল্প সচল রাখা সম্ভব নয়।
দেশে কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের যাত্রা শুরু হয় প্রায় এক দশক আগে। এরই মধ্যে বিএসআরএম ও কাজী ফার্মসের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠী এ খাতে কয়েকশ কোটি টাকার বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, বর্তমান শুল্ক প্রস্তাব চূড়ান্ত হলে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে এবং বিদ্যমান কারখানাগুলোর ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
এ পরিস্থিতিতে বিদেশ থেকে আমদানি করা খোসা ছাড়ানো প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের দাবি জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, এ ধরনের শুল্ক সব দেশের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে এবং সাফটা চুক্তির সুবিধা ব্যবহার করে কেউ প্রতিযোগিতায় অতিরিক্ত সুবিধা নিতে পারবে না।
প্রস্তাবিত বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর ক্যাশু প্রসেসরসের সভাপতি মোহাম্মদ আজাদ ইকবাল পাঠান বলেন, শুধু আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে সম্পূরক শুল্ক আরোপ প্রয়োজন। এতে স্থানীয় শিল্প টিকে থাকার সুযোগ পাবে এবং আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!