বিয়ের মাধ্যমে শুধু দুজন মানুষের নয়, দুটি পরিবারেরও সম্পর্ক তৈরি হয়। এই সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত করতে পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যের গুরুত্ব ইসলামে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আমাদের সমাজে অনেকেই শ্বশুর-শাশুড়িকে সম্মান করে ‘আব্বা-আম্মা’, ‘বাবা-মা’ বা অনুরূপ সম্বোধনে ডাকেন। তবে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, হাদিসে তো অন্যকে নিজের পিতা বলে পরিচয় দিতে নিষেধ করা হয়েছে, তাহলে শ্বশুর-শাশুড়িকে ‘বাবা-মা’ বলা কি শরিয়তসম্মত?
বংশপরিচয় সংরক্ষণে ইসলামের গুরুত্ব
ইসলাম বংশপরিচয় সংরক্ষণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
“তোমরা তাদেরকে তাদের পিতার নামেই ডাক; এটিই আল্লাহর নিকট অধিক ন্যায়সঙ্গত।”
(সুরা আহজাব: ৫)
এই আয়াতের মাধ্যমে দত্তক সন্তানকে নিজের সন্তান হিসেবে পরিচয় দেওয়ার প্রচলিত প্রথা সংশোধন করা হয়েছে। ইসলাম প্রত্যেক মানুষের প্রকৃত বংশপরিচয় সংরক্ষণের ওপর জোর দিয়েছে।
অন্যকে পিতা দাবি করার ব্যাপারে হাদিসের সতর্কতা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“যে ব্যক্তি জেনে-শুনে নিজেকে নিজের পিতা ছাড়া অন্য কারো সন্তান বলে দাবি করে, তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যায়।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৭৬৬)
অন্য এক হাদিসে এসেছে,
“যে ব্যক্তি জেনে-শুনে নিজ পিতা ছাড়া অন্যকে নিজের পিতা বলে দাবি করে, সে বড় ধরনের অপরাধে লিপ্ত হয়।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৫০৮)
এখানে স্পষ্ট যে, নিষেধাজ্ঞাটি বংশপরিচয় পরিবর্তন করা বা প্রকৃত পিতাকে অস্বীকার করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সম্মানসূচক সম্বোধনের ক্ষেত্রে নয়।
শ্বশুর-শাশুড়িকে ‘বাবা-মা’ বলা কি জায়েজ?
ইসলামি ফিকহবিদদের মতে, সম্মান, ভালোবাসা ও সৌজন্যের খাতিরে শ্বশুর-শাশুড়িকে ‘আব্বা-আম্মা’, ‘বাবা-মা’ বা অনুরূপ শব্দে সম্বোধন করা সম্পূর্ণ জায়েজ।
কারণ এতে নিজের প্রকৃত পিতার পরিচয় গোপন করা হয় না এবং শ্বশুরকে জন্মদাতা পিতা হিসেবে দাবি করা হয় না। এটি কেবল একটি সম্মানসূচক সম্বোধন।
আমাদের সমাজে যেমন বয়োজ্যেষ্ঠ কাউকে ‘চাচা’, ‘মামা’ বা ‘বাবা’ বলে ডাকা হয়, কিংবা শিক্ষককে অনেক সময় আধ্যাত্মিক অভিভাবক হিসেবে সম্মান দেওয়া হয়, তেমনি শ্বশুর-শাশুড়িকে ‘বাবা-মা’ বলা পারিবারিক সৌহার্দ্য ও শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ।
কোরআনের আলোকে সদাচরণের শিক্ষা
আল্লাহ তাআলা বলেন,
“মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বল।”
(সুরা বাকারা: ৮৩)
আরও বলেন,
“তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সঙ্গে উত্তম আচরণ কর।”
(সুরা নিসা: ১৯)
উত্তম আচরণের অংশ হিসেবে স্বামী-স্ত্রীর উভয়েরই একে অপরের পিতা-মাতার প্রতি সম্মান ও সৌজন্য প্রদর্শন করা উচিত। এতে পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয় এবং সম্পর্কের মধ্যে আন্তরিকতা বৃদ্ধি পায়।
কোথায় প্রকৃত পিতার নাম ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক?
ইসলাম স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেয় যে, পরিচয় সংক্রান্ত সব আনুষ্ঠানিক নথিতে অবশ্যই জন্মদাতা পিতার নাম ব্যবহার করতে হবে।
যেমন—
- জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)
- জন্মনিবন্ধন
- পাসপোর্ট
- শিক্ষাসনদ
- সরকারি চাকরির আবেদন
- ব্যাংকিং ও আইনি নথিপত্র
এসব ক্ষেত্রে অন্য কারও নাম ব্যবহার করা বা প্রকৃত পিতার পরিচয় গোপন করা গুরুতর গুনাহ এবং শরিয়তসম্মত নয়।
ইসলামি দৃষ্টিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
ইসলাম বংশপরিচয় রক্ষার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। তাই জন্মদাতা পিতাকে অস্বীকার করে অন্যকে পিতা হিসেবে পরিচয় দেওয়া বা সরকারি নথিতে অন্যের নাম ব্যবহার করা হারাম।
তবে শ্বশুর-শাশুড়িকে সম্মান, ভালোবাসা ও পারিবারিক সৌহার্দ্যের কারণে ‘আব্বা-আম্মা’, ‘বাবা-মা’ বা অনুরূপ শব্দে সম্বোধন করা সেই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং এটি বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক দৃঢ় করা এবং পারিবারিক বন্ধন শক্তিশালী করার একটি সুন্দর মাধ্যম।
অতএব, শ্বশুর-শাশুড়িকে সম্মানার্থে ‘আব্বা-আম্মা’, ‘আব্বু-আম্মু’ বা ‘বাবা-মা’ বলে সম্বোধন করা শরিয়তসম্মত ও জায়েজ। এতে কোনো গুনাহ নেই; বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি প্রশংসনীয় আচরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!