প্রতিবছর হজ ও ওমরাহ পালনের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা লাখো মুসল্লি পবিত্র কাবা শরিফ তাওয়াফ করেন। তাওয়াফের সময় অনেকের দৃষ্টি আটকে যায় কাবার গায়ে জড়ানো কালো গিলাফ বা কিসওয়ার দিকে। সোনা ও রুপার সুতোয় বোনা এই গিলাফে খচিত থাকে পবিত্র কোরআনের আয়াত ও নান্দনিক আরবি ক্যালিগ্রাফি। তবে অনেকেরই জানা নেই, এই ক্যালিগ্রাফির নেপথ্যে রয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিল্পী মুখতার আলম সিকদার।

দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে কাবার গিলাফের প্রধান ক্যালিগ্রাফার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। সম্প্রতি তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সৌদি আরব সরকার তাকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করেছে। সৌদি আরবের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখা বিদেশি পেশাজীবীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার রাজকীয় উদ্যোগের আওতায় তিনি এই সম্মান লাভ করেন।

মুখতার আলমের পৈতৃক বাড়ি চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার রশিদের ঘোনা গ্রামে। তাঁর বাবা মফিজুর রহমান বিন ইসমাইল সিকদার। তবে মুখতার আলমের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সৌদি আরবে। ছোটবেলা থেকেই আরবি ক্যালিগ্রাফির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল।

শিক্ষাজীবনে তিনি মক্কার উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯২ সালে চারুকলা বিষয়ে স্নাতক এবং ২০০১ সালে ক্যালিগ্রাফিতে বিশেষায়িত স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে ক্যালিগ্রাফির শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

কাবার গিলাফের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার শুরু ২০০২ সালে। জেদ্দার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ক্যালিগ্রাফার মুহাম্মদ সালেম বাজনাইদের মাধ্যমে তাঁর কাজ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। পরে উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি বিশেষ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সফলভাবে উত্তীর্ণ হন তিনি। এরপর ১৪২৩ হিজরির জমাদিউল আউয়াল মাসে, অর্থাৎ ২০০২ সালের জুলাইয়ে মক্কার কিসওয়া কারখানার প্রধান ক্যালিগ্রাফার হিসেবে নিয়োগ পান।

কাবার গিলাফে মূলত ‘থুলুথ’ লিপিতে কোরআনের আয়াত লেখা হয়। এই লিপির ঐতিহ্যবাহী নকশা অক্ষুণ্ন রেখেই মুখতার আলম এর বিভিন্ন অংশে সূক্ষ্ম নান্দনিক পরিবর্তন আনেন। অক্ষরের গঠন, অনুপাত, বৃত্ত ও ফ্রেমের বিন্যাস আরও নিখুঁত করে তুলেছেন তিনি। একই সঙ্গে কাবার দরজার পর্দা ও গিলাফের অলংকারিক নকশাতেও যুক্ত করেছেন নতুন মাত্রা।

শুধু ঐতিহ্যগত ক্যালিগ্রাফিতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি। কাজের ধারাবাহিকতা ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারও শুরু করেন। কিসওয়ার নকশা তৈরিতে তিনি বিশেষায়িত ইলেকট্রনিক ক্যালিগ্রাফি পদ্ধতি চালু করেন, যা বর্তমানে এই শিল্পকর্মের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

ক্যালিগ্রাফির পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা ও কোরআন শিক্ষার ক্ষেত্রেও রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান। ১৯৮০ সালে তিনি মক্কার কোরআন মুখস্থকরণ সংস্থায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং দীর্ঘ ১৩ বছর সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া মাসজিদুল হারামের ভেতরে অবস্থিত দার আল-আরকাম ইনস্টিটিউটেও শিক্ষকতা করেছেন।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বীকৃতি পেয়েছেন মুখতার আলম। ১৯৮৯ সালে তুরস্কে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক আরবি ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতায় তিনি পুরস্কার অর্জন করেন। ২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতার বিচারকের দায়িত্বও পালন করেছেন।

সৌদি নাগরিকত্ব পাওয়ার পর তাঁর সম্মানে বিশেষ সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। মাসজিদুল হারামের প্রধান ইমাম তাঁর হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন শিল্পীর এমন অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বিশ্ব মুসলিম সমাজে বাংলাদেশের জন্যও গৌরবের বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!