ভূমি অফিসে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে না পাওয়া, দিনের পর দিন ফাইল ঝুলে থাকা, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য কিংবা সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগ নতুন কিছু নয়। নামজারি, খতিয়ান, ভূমি উন্নয়ন কর বা রেকর্ড সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা নিতে গিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এবার এসব সমস্যা কমাতে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহি বাড়াতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়।
প্রযুক্তিনির্ভর একটি নতুন মনিটরিং ব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে দেশের ভূমি প্রশাসনকে। মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি ও কার্যক্রম রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা হবে। জিও-লোকেশন এবং জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা কর্মস্থলে আছেন কি না, অফিস চলাকালে কোথায় অবস্থান করছেন এবং মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছেন কি না—এসব তথ্য পর্যবেক্ষণ করা হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ধাপে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং গাজীপুর জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে এই কার্যক্রম চালু করা হবে। পাইলট প্রকল্প সফল হলে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য জেলাতেও এটি সম্প্রসারণ করা হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে মন্ত্রণালয়, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসন এবং উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের তদারকি কার্যক্রম পরিচালিত হলেও দেশের হাজারো ভূমি অফিসে প্রতিদিন সরাসরি নজরদারি করা সম্ভব নয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি কিংবা দায়িত্ব পালনে গাফিলতির অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটালাইজেশন, নলেজ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড পারফরম্যান্স (ডিকেএমপি) অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থা চালুর মূল উদ্দেশ্য হলো মাঠপর্যায়ের ভূমি অফিসগুলোতে সেবা প্রদানের মান উন্নত করা এবং কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি ভূমি অফিস বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মক্ষেত্রের জন্য একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ করা হবে। কর্মকর্তা বা কর্মচারী অফিসে প্রবেশ করলে, মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করলে কিংবা পুনরায় অফিসে ফিরে এলে সেই তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিস্টেমে সংরক্ষিত হবে। এর ফলে দায়িত্ব পালনের অজুহাতে দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থাকার সুযোগ অনেকাংশে কমে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে এ প্রকল্পের জন্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় মোবাইল অ্যাপ তৈরি করার প্রক্রিয়া চলছে। তবে কোন প্রতিষ্ঠান এ কাজ করবে এবং প্রকল্পের মোট ব্যয় কত হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অ্যাপ চালুর আগে একটি বিস্তারিত ইউজার ম্যানুয়াল তৈরি করা হবে। সেখানে সফটওয়্যার ব্যবহারের নিয়ম, তথ্য সংরক্ষণ পদ্ধতি, মনিটরিংয়ের সীমা এবং জবাবদিহি সংক্রান্ত বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। বর্তমানে সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং পাইলট বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে। আগামী জুলাই বা আগস্টের মধ্যেই পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে এই উদ্যোগের সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন পর্যবেক্ষণের প্রকল্প নয়। বরং সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নির্ধারিত কর্মস্থলে উপস্থিত আছেন কি না এবং জনগণকে সেবা দিচ্ছেন কি না, তা নিশ্চিত করাই এর মূল উদ্দেশ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমি সেবা সরাসরি মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে জড়িত। তাই প্রযুক্তিনির্ভর এই নজরদারি ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সেবার মান বাড়বে, অনিয়ম কমবে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
এখন পরীক্ষামূলক প্রকল্পের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে, দেশের ভূমি প্রশাসনে ডিজিটাল নজরদারির এই নতুন যুগ কতটা সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
সূত্র: জাগো নিউজ
আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!