বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে আলোচিত ও সমালোচিত এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে নতুন নামে একটি বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নতুন বাহিনীর নাম রাখা হচ্ছে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ বা এসআরবি (SRB)।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত একটি প্রাথমিক আইন খসড়া প্রস্তুত করেছে বলে জানা গেছে। খসড়া অনুযায়ী, বর্তমান র্যাবকে বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ পুলিশের সহায়ক বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে এসআরবি গঠন করা হবে। শিগগিরই খসড়াটি মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নতুন বাহিনী গঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও গণমুখী করা। দীর্ঘদিন ধরে র্যাবের বিরুদ্ধে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের প্রতিবেদনে র্যাবের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এমনকি একাধিকবার বাহিনীটির সংস্কার কিংবা বিলুপ্তির সুপারিশও করা হয়েছিল।
খসড়া আইনে বলা হয়েছে, র্যাবের বিদ্যমান সব সম্পদ, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, তহবিল, ব্যাংক হিসাব, সরঞ্জাম, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং চলমান কার্যক্রম নতুন এসআরবির অধীনে চলে যাবে। অর্থাৎ বাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামোয় পরিবর্তন এলেও কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।
নতুন বাহিনীর দায়িত্বের মধ্যে থাকবে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ দমন, মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং বিশেষ অপরাধ তদন্তে সহায়তা করা। এছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও সহযোগিতা করবে এসআরবি।
খসড়া আইনে বাহিনীটিকে প্রবেশ, তল্লাশি এবং গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ, সন্ত্রাসী কার্যক্রম কিংবা অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনার সুযোগ থাকবে নতুন এই ইউনিটের।
২০০৪ সালের ২৬ মার্চ র্যাব গঠন করা হয় এবং একই বছরের ১৪ এপ্রিল আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে বাহিনীটি। বাংলাদেশ পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, কোস্টগার্ড ও আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত এই বাহিনী জঙ্গিবাদ দমন, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং মাদকবিরোধী কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তবে এর পাশাপাশি বিভিন্ন সময় বিতর্কও পিছু ছাড়েনি। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনা, গুমের অভিযোগ এবং কথিত ক্রসফায়ার নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে র্যাব। ২০২১ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পরে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থাও বাহিনীটির সংস্কার কিংবা বিলুপ্তির সুপারিশ করে।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, এসব বিতর্ক থেকে বেরিয়ে এসে নতুন আইনগত কাঠামোর মাধ্যমে একটি আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক বিশেষায়িত বাহিনী গড়ে তোলাই সরকারের মূল লক্ষ্য। নতুন এসআরবির কার্যক্রম যাতে আইনের মধ্যে থেকে পরিচালিত হয় এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এড়ানো যায়, সে বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু নাম পরিবর্তন নয়, বরং কার্যক্রমে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারলেই জনগণের আস্থা অর্জন সম্ভব হবে। কারণ র্যাব দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও বিতর্কের কারণে বাহিনীটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নতুন এসআরবি সেই ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের সুযোগ পেতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, মন্ত্রিসভা ও সংসদের অনুমোদনের পর নতুন বাহিনী কত দ্রুত বাস্তবায়ন হয় এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসে।
সূত্র: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের খসড়া আইন
আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!