দেশে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের আয় ও সঞ্চয়ের ওপর চাপ তৈরি করলেও নিরাপদ বিনিয়োগের খোঁজে সঞ্চয়পত্রের প্রতি আগ্রহ এখনো রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও নিয়মিত আয়ের ওপর নির্ভরশীল অনেক মানুষ তুলনামূলক নিরাপদ ও নির্ধারিত মুনাফার কারণে সঞ্চয়পত্রকে বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করছেন। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, সঞ্চয়পত্রের সামগ্রিক নিট বিনিয়োগের চিত্র সবসময় ঊর্ধ্বমুখী নয়; বরং মূল্যস্ফীতি ও পারিবারিক ব্যয়ের চাপের কারণে অনেক সময় পুরোনো সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত জাতীয় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ঋণাত্মক ছিল। এপ্রিল ২০২৬ মাসে নিট বিক্রি ছিল প্রায় ৪২৯ কোটি টাকা ঋণাত্মক। অর্থাৎ ওই সময়ে নতুন করে যত সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, তার তুলনায় মূলধন ফেরত দেওয়ার পরিমাণ বেশি ছিল। একই সময়ে মোট সঞ্চয়পত্রের স্থিতি প্রায় ৩ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি ছিল।

এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ঋণাত্মক ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক তথ্য অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল ৬৮ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা, বিপরীতে মূলধন পরিশোধ ছিল ৭৪ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার মতো। ফলে পুরো অর্থবছরে নিট বিক্রি দাঁড়ায় প্রায় ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা ঋণাত্মক।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি বেশি থাকলে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। তখন নতুন করে সঞ্চয় করার সক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি অনেক পরিবার দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে আগের সঞ্চয় ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। সাম্প্রতিক সময়ে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর প্রবণতার পেছনেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্যকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে সঞ্চয়পত্রকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ পুরোপুরি কমে যায়নি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অন্যান্য বিনিয়োগ খাতে অনিশ্চয়তার মধ্যে অনেক মানুষ এমন একটি জায়গায় অর্থ রাখতে চান যেখানে রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তা রয়েছে এবং নির্ধারিত হারে মুনাফা পাওয়া যায়। এ কারণে যাদের হাতে অতিরিক্ত সঞ্চয় রয়েছে এবং যারা তুলনামূলক কম ঝুঁকির বিনিয়োগ খুঁজছেন, তাদের কাছে সঞ্চয়পত্র এখনো গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের আওতায় বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, পরিবার সঞ্চয়পত্র ও পেনশনার সঞ্চয়পত্র উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন শ্রেণির বিনিয়োগকারীর প্রয়োজন অনুযায়ী এসব স্কিমের মেয়াদ, মুনাফা পাওয়ার ধরন ও বিনিয়োগের শর্ত ভিন্ন।

২০২৬ সালের জুলাই থেকে পরবর্তী ছয় মাসের জন্য সঞ্চয়পত্রের বিদ্যমান মুনাফার হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্রে বর্তমান মুনাফার হার প্রায় ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশের মধ্যে রয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এর ফলে নতুন করে মুনাফার হার কমানো হয়নি এবং আগের হারই বহাল রয়েছে।

তবে বিনিয়োগকারীদের হাতে পাওয়া প্রকৃত মুনাফায় করের প্রভাব পড়ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন কর ব্যবস্থায় সঞ্চয়পত্রের মুনাফা উত্তোলনের সময় ১০ শতাংশ হারে অগ্রিম কর কেটে রাখার বিধান করা হয়েছে, যা আগে ৫ শতাংশ ছিল। ফলে একই হারে মুনাফা নির্ধারিত থাকলেও কর কাটার পর বিনিয়োগকারীর হাতে পাওয়া অর্থ আগের তুলনায় কম হতে পারে।

সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মুনাফার তুলনা। কোনো বিনিয়োগের নামমাত্র মুনাফা বেশি হলেও যদি একই সময়ে পণ্য ও সেবার দাম দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে সেই মুনাফার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে। তাই শুধু মুনাফার হার দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে মূল্যস্ফীতি, কর, বিনিয়োগের মেয়াদ এবং অর্থের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে সরকারও সঞ্চয়পত্র বিক্রির কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। জুন ২০২৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে সঞ্চয়পত্র বিক্রির কার্যক্রম যথাযথভাবে চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেয়। এর আগে কিছু ব্যাংক গ্রাহকদের সঞ্চয়পত্র কিনতে নিরুৎসাহিত করছে—এমন অভিযোগ পাওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিষয়টি পরিদর্শন করে।

সব মিলিয়ে, ‘মূল্যস্ফীতির মধ্যেও সঞ্চয়পত্রে বাড়ছে বিনিয়োগ’—এমন একটি সরল চিত্রের বদলে বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। সঞ্চয়পত্রের প্রতি নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে আগ্রহ রয়েছে, কিন্তু সামগ্রিক নিট বিনিয়োগ এখনো মূল্যস্ফীতি ও মানুষের আয়-ব্যয়ের চাপের কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে। ফলে ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে পারলে সঞ্চয়পত্রে নতুন বিনিয়োগের প্রবণতা আরও শক্তিশালী হতে পারে।

ℹ️আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!