বাংলাদেশের বিদেশগামী কর্মী ও প্রবাসীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুখবর এসেছে। সরকারি বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক শিগগিরই শরিয়াহভিত্তিক সুদ-মুক্ত ঋণ সেবা চালু করতে যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যারা ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে সুদভিত্তিক ঋণ গ্রহণ করতে অনাগ্রহী, তাদের জন্য ইসলামী শরিয়াহর নীতিমালা অনুসরণ করে একটি বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থা চালু করা হবে। এর মাধ্যমে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ আরও সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়া বাংলাদেশিদের জন্য এই উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে আইন, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল জানান, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়ন চালুর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চলছে। তিনি বলেন, অনেক প্রবাসী ও বিদেশগামী কর্মী সুদভিত্তিক ঋণ গ্রহণে আগ্রহী নন। ফলে তাদের কথা বিবেচনা করেই শরিয়াহসম্মত একটি অর্থায়ন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে এবং আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের পর ধাপে ধাপে সেবাটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

বর্তমানে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক বিদেশগামী কর্মীদের জন্য জামানতবিহীন অভিবাসন ঋণ, পুনর্বাসন ঋণ, দক্ষতা উন্নয়ন ঋণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের অর্থায়ন সুবিধা দিয়ে আসছে। এসব ঋণের মাধ্যমে বিদেশে যাওয়ার বিমান ভাড়া, ভিসা, প্রশিক্ষণ, মেডিকেল পরীক্ষা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হয়। তবে বিদ্যমান ঋণ কার্যক্রম প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত হওয়ায় অনেকেই ধর্মীয় কারণে এই সুবিধা গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। নতুন শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়ন চালু হলে তাদের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য ও বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়ন চালুর মূল উদ্দেশ্য হলো বিদেশগামী কর্মীদের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহজলভ্য আর্থিক সেবা নিশ্চিত করা। দেশের অনেক মানুষ সুদভিত্তিক লেনদেন এড়িয়ে চলতে চান। তাদের জন্য ইসলামী ব্যাংকিং নীতিমালা অনুসরণ করে অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি হলে বিদেশে বৈধভাবে কর্মসংস্থানের আগ্রহ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে দালাল বা অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নেওয়ার প্রবণতাও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

যদিও শরিয়াহভিত্তিক সুদ-মুক্ত ঋণ চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অর্থায়নের ধরন, লাভ বণ্টনের পদ্ধতি, আবেদন প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, অর্থায়নের সর্বোচ্চ সীমা, পরিশোধের সময়সীমা কিংবা যোগ্যতার শর্ত সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রকাশ করেনি। ফলে ঠিক কোন পদ্ধতিতে এই অর্থায়ন পরিচালিত হবে, তা জানতে ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক নীতিমালা প্রকাশের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সম্ভবত ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মুরাবাহা, মুশারাকা বা অন্যান্য শরিয়াহসম্মত অর্থায়ন কাঠামোর আলোকে পরিচালিত হতে পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

শরিয়াহভিত্তিক ঋণ সেবা চালু না হওয়া পর্যন্ত প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের বিদ্যমান অভিবাসন ঋণ কার্যক্রম আগের নিয়মেই চলবে। বর্তমানে নতুন ভিসা এবং রি-এন্ট্রি ভিসাধারী বিদেশগামী কর্মীরা সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত অভিবাসন ঋণের জন্য আবেদন করতে পারেন। নতুন ভিসাধারীদের ক্ষেত্রে ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ৩ বছর এবং রি-এন্ট্রি ভিসাধারীদের জন্য সর্বোচ্চ ২ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিকভাবে জমা দিলে সাধারণত সাত কর্মদিবসের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তির চেষ্টা করে ব্যাংক।

বর্তমানে ঋণের আবেদন করতে জাতীয় পরিচয়পত্র, বৈধ পাসপোর্ট, বিদেশে কর্মসংস্থানের ভিসা, বিএমইটির (BMET) স্মার্ট কার্ড, পাসপোর্ট সাইজের ছবি এবং ব্যাংকের নির্ধারিত অন্যান্য কাগজপত্র জমা দিতে হয়। প্রয়োজনে একজন জামিনদারের তথ্য এবং ব্যাংক হিসাবও প্রয়োজন হতে পারে। শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়ন চালু হলেও আবেদন প্রক্রিয়ার মৌলিক অংশে বড় ধরনের পরিবর্তন নাও আসতে পারে। তবে নতুন নীতিমালা প্রকাশের পর আবেদন পদ্ধতি ও শর্তাবলিতে কিছু পরিবর্তন যুক্ত হতে পারে।

অর্থনীতিবিদ ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়ন চালু হলে বিদেশগামী কর্মীদের জন্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরও বৃদ্ধি পাবে। যারা এতদিন ধর্মীয় কারণে প্রচলিত ঋণ গ্রহণ করেননি, তারাও বৈধ ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় অর্থায়নের সুযোগ পাবেন। এর ফলে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ সহজ হবে, অনানুষ্ঠানিক ঋণদাতাদের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে এবং নিরাপদ অভিবাসন আরও উৎসাহিত হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সব মিলিয়ে, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে শরিয়াহভিত্তিক সুদ-মুক্ত ঋণ সেবা চালুর উদ্যোগ দেশের বিদেশগামী কর্মীদের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে সেবা চালুর আগে আবেদনকারীদের ব্যাংকের অফিসিয়াল নীতিমালা, যোগ্যতা, আবেদন প্রক্রিয়া এবং অর্থায়নের শর্তাবলি সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য জেনে নেওয়া উচিত। নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ হলে আগ্রহীরা প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ওয়েবসাইট অথবা নিকটস্থ শাখা থেকে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে আবেদন করতে পারবেন।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!