স্বপ্ন মানুষের জীবনের একটি রহস্যময় অধ্যায়। ঘুমের মধ্যে দেখা কিছু স্বপ্ন মানুষ সহজেই ভুলে যায়, আবার কিছু স্বপ্ন দীর্ঘদিন মনে থেকে যায়। বিশেষ করে কোনো মৃত আত্মীয়, বন্ধু বা পরিচিত ব্যক্তিকে স্বপ্নে জীবিত অবস্থায় দেখলে অনেকের মনেই কৌতূহল, দুশ্চিন্তা কিংবা ভয় কাজ করে। কেউ এটিকে অশুভ সংকেত মনে করেন, আবার কেউ ভবিষ্যতের কোনো ঘটনার ইঙ্গিত বলে বিশ্বাস করেন। কিন্তু ইসলাম এ বিষয়ে কী শিক্ষা দেয়? কোরআন-হাদিসের আলোকে স্বপ্নে মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখার ব্যাখ্যা কী—এ নিয়ে রয়েছে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা।
ইসলামে স্বপ্নের গুরুত্ব স্বীকার করা হলেও প্রতিটি স্বপ্নকে সত্য বা ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে গ্রহণ করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। ইসলামী শিক্ষায় স্বপ্নকে সাধারণভাবে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমটি হলো রহমানি স্বপ্ন, যা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সুসংবাদ বা কল্যাণের ইঙ্গিত হতে পারে। দ্বিতীয়টি শয়তানি স্বপ্ন, যার উদ্দেশ্য মানুষকে ভয়, দুশ্চিন্তা বা অস্থিরতায় ফেলা। তৃতীয়টি নফসানি স্বপ্ন, যা মানুষের নিজের চিন্তা, স্মৃতি, আবেগ বা দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার প্রতিফলন।
ইসলামী গবেষকরা বলেন, স্বপ্নে মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখা এই তিন ধরনের যেকোনো একটি হতে পারে। তাই শুধুমাত্র এমন স্বপ্ন দেখার ভিত্তিতে কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। বরং স্বপ্নের পরিবেশ, মৃত ব্যক্তির অবস্থা এবং স্বপ্নদ্রষ্টার মানসিক অবস্থার ওপর এর ব্যাখ্যা নির্ভর করতে পারে।
যদি কেউ স্বপ্নে কোনো মৃত ব্যক্তিকে সুস্থ, হাসিখুশি বা শান্ত অবস্থায় দেখেন, তাহলে অনেক আলেমের ব্যাখ্যায় এটিকে আশাব্যঞ্জক স্বপ্ন হিসেবে ধরা হয়। এটি মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর রহমতের আশা জাগাতে পারে কিংবা স্বপ্নদ্রষ্টার জন্য মানসিক প্রশান্তির কারণ হতে পারে। তবে ইসলামী বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, এমন স্বপ্নকে মৃত ব্যক্তির প্রকৃত অবস্থার নিশ্চিত প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। কারণ গায়েবের জ্ঞান একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলার কাছেই রয়েছে।
অন্যদিকে, যদি স্বপ্নে মৃত ব্যক্তিকে কষ্টে, কান্নারত বা উদ্বিগ্ন অবস্থায় দেখা যায়, তাহলে ভয় বা আতঙ্কিত হওয়ার পরিবর্তে তার জন্য বেশি বেশি দোয়া, ইস্তিগফার এবং সদকা করার পরামর্শ দিয়েছেন আলেমরা। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এমন স্বপ্ন অনেক সময় মানুষকে মৃত আত্মীয়-স্বজনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং তাদের জন্য দোয়া করার অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে। তবে এটিকেও নিশ্চিত কোনো বার্তা হিসেবে গ্রহণ করা সঠিক নয়।
অনেক সময় দেখা যায়, স্বপ্নে মৃত ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় কথা বলছেন। এ ধরনের স্বপ্ন নিয়ে সমাজে নানা ধরনের প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে। ইসলামী বিশেষজ্ঞরা বলেন, যদি স্বপ্নে কোনো ভালো কাজের উপদেশ, আল্লাহকে স্মরণ করার আহ্বান বা গুনাহ থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়, তাহলে একজন মুসলমান আত্মসমালোচনা করতে পারেন এবং নিজের আমল সংশোধনের চেষ্টা করতে পারেন। তবে স্বপ্নে শোনা কোনো কথাকে শরিয়তের বিধান বা নতুন ধর্মীয় নির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ করা সম্পূর্ণ অনুচিত।
মনোবিজ্ঞানীরাও মনে করেন, প্রিয়জনের মৃত্যু মানুষের মনে গভীর আবেগের সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিন ধরে সেই মানুষটির স্মৃতি, শোক বা ভালোবাসা থেকে অনেক সময় তাকে স্বপ্নে দেখা স্বাভাবিক ঘটনা। ইসলামী পরিভাষায় এটিকে নফসানি স্বপ্ন বলা হয়, যা মানুষের অবচেতন মন ও আবেগের প্রতিফলন। তাই এমন স্বপ্ন দেখলেই ভবিষ্যতে কোনো অমঙ্গল ঘটবে—এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।
ইসলামে খারাপ বা ভীতিকর স্বপ্ন দেখার ক্ষেত্রেও কিছু আদব শেখানো হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শিক্ষা দিয়েছেন, অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে, বাম দিকে হালকা তিনবার থুতুর মতো ফুঁ দিতে হবে এবং অযথা সবার কাছে সেই স্বপ্ন বর্ণনা না করাই উত্তম। অন্যদিকে ভালো স্বপ্ন দেখলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং বিশ্বস্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তির সঙ্গে তা শেয়ার করা যেতে পারে।
আলেমরা আরও বলেন, স্বপ্নে মৃত ব্যক্তিকে দেখার পর সবচেয়ে উত্তম আমল হলো তার জন্য দোয়া করা, আল্লাহর কাছে মাগফিরাত কামনা করা, ইস্তিগফার পড়া এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সদকা করা। কারণ ইসলামী শরিয়তে মৃত ব্যক্তির উপকারে আসে এমন আমলের মধ্যে দোয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সমাজে স্বপ্ন নিয়ে নানা ধরনের কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। অনেকে মনে করেন, স্বপ্নে মৃত ব্যক্তিকে দেখলে শিগগিরই কোনো অমঙ্গল ঘটবে বা পরিবারের আরেকজন মারা যাবেন। আবার কেউ মনে করেন, এটি ভবিষ্যতের নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী। ইসলামী শিক্ষায় এসব ধারণার কোনো গ্রহণযোগ্য ভিত্তি নেই। গায়েবের খবর একমাত্র মহান আল্লাহই জানেন এবং স্বপ্নের ওপর ভিত্তি করে মানুষের ভাগ্য বা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না।
সব মিলিয়ে স্বপ্নে মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখা সব সময় ভয়ের কারণ নয়। এটি কখনো মানুষের আবেগের প্রতিফলন, কখনো দোয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার উপলক্ষ, আবার কখনো আত্মসমালোচনার সুযোগ হতে পারে। তবে কোনো স্বপ্নের ওপর ভিত্তি করে ধর্মীয় বা পারিবারিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। একজন মুসলমানের করণীয় হলো আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা, মৃতদের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা, কুসংস্কার থেকে দূরে থাকা এবং কোরআন-সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনা করা।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!