ইসলামে বদনজর বা কুদৃষ্টির বাস্তবতা স্বীকৃত। অনেক সময় মানুষের সৌন্দর্য, সন্তান, সম্পদ, ব্যবসায় সফলতা, ভালো ফলাফল কিংবা অন্য কোনো নিয়ামত দেখে কারও হিংসা বা কুদৃষ্টি ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই মহান আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা এবং রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর শেখানো মাসনুন দোয়া নিয়মিত পড়ার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইসলামী বিশেষজ্ঞরা বলেন, একজন মুমিনের নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা এবং তাঁর শেখানো দোয়া ও যিকিরের আমল।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসে বদনজরের বাস্তবতার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেছেন, “বদনজর সত্য।” অর্থাৎ হিংসা বা কুদৃষ্টির প্রভাব ইসলামে অস্বীকার করা হয় না। তবে একজন মুমিনের বিশ্বাস, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোনো ক্ষতি বা উপকারই কারও পক্ষে সম্ভব নয়। তাই যেকোনো ধরনের অশুভ প্রভাব থেকে বাঁচার জন্য মহান আল্লাহর কাছেই আশ্রয় চাইতে হবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে এবং তাঁর পরিবার-পরিজনের জন্য যে দোয়াগুলো পড়তেন, তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া হলো—

أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللّٰهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ

এর বাংলা উচ্চারণ—

আ’উযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক।

বাংলা অর্থ—

আমি আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ কালিমা সমূহের মাধ্যমে তাঁর সৃষ্ট সব কিছুর অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।

ইসলামী গবেষকরা বলেন, এই দোয়ার মাধ্যমে একজন মুসলমান মহান আল্লাহর কাছে সব ধরনের অকল্যাণ, হিংসা, কুদৃষ্টি, অজানা বিপদ এবং সৃষ্টিজগতের অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা কামনা করেন। তাই এটি শুধু বদনজর নয়, বরং যেকোনো অশুভ পরিস্থিতিতে পড়ার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসনুন দোয়া।

হাদিসে আরও বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর নাতি হাসান (রা.) ও হুসাইন (রা.)-এর জন্য আল্লাহর কাছে আশ্রয় কামনা করতেন এবং তাদের ওপর দোয়া পড়ে দিতেন। এ থেকে আলেমরা বলেন, সন্তানদের জন্য নিয়মিত দোয়া করা এবং আল্লাহর হেফাজত কামনা করা সুন্নত। বর্তমান সময়ে অনেক বাবা-মা সন্তানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। তাই শিশুদের জন্য সকাল-সন্ধ্যায় মাসনুন দোয়া পড়ে ফুঁ দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত উত্তম আমল।

ইসলামে বদনজর থেকে বাঁচার জন্য শুধু একটি দোয়াই নয়, বরং নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যার যিকির, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক এবং সূরা নাস পাঠের প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব আমল একজন মুসলমানকে আল্লাহর হেফাজতের ছায়ায় রাখে এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা ও অশুভ প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত।

আলেমরা বলেন, অনেকেই বদনজর থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন কুসংস্কার, তাবিজ-কবজ বা ভিত্তিহীন পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেন। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো, নিরাপত্তা ও হেফাজতের জন্য একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়া ও যিকিরের আমল করা। সুন্নাহসম্মত আমলের বাইরে ভিত্তিহীন বিশ্বাস বা কুসংস্কারে জড়িয়ে পড়া একজন মুসলমানের জন্য সমীচীন নয়।

ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, বদনজর থেকে বাঁচতে নিজের জীবনের নিয়ামত নিয়ে অহংকার না করা, অন্যের নিয়ামত দেখে “মাশাআল্লাহ” বা “বারাকাল্লাহ” বলা এবং আল্লাহর প্রশংসা করা উত্তম। এতে হিংসা ও কুদৃষ্টির প্রবণতা কমে এবং সমাজে পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় থাকে।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত জীবন, সন্তান, সম্পদ বা অর্জনের ছবি ও তথ্য অতিরিক্ত প্রকাশের বিষয়েও অনেক আলেম সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। কারণ অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যক্তিগত বিষয় সবার সামনে তুলে ধরলে হিংসা বা কুদৃষ্টির আশঙ্কা বেড়ে যেতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সবকিছু গোপন রাখতে হবে; বরং সংযম ও প্রজ্ঞার সঙ্গে চলাই ইসলামের শিক্ষা।

সব মিলিয়ে বদনজর একটি বাস্তব বিষয়, যা ইসলামে স্বীকৃত। তবে একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মহান আল্লাহর ওপর অটুট ভরসা। তাই প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় মাসনুন দোয়া ও যিকির পড়া, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা, কোরআন তিলাওয়াত করা এবং আল্লাহর কাছে হেফাজত কামনা করাই একজন মুসলমানের জন্য সর্বোত্তম পথ। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের, আমাদের পরিবার এবং সব মুসলমানকে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সব ধরনের অনিষ্ট থেকে হেফাজত করেন।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!