মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ, স্বাচ্ছন্দ্য ও সংকট—সবই মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে পরীক্ষা। কখনো অসুস্থতা, কখনো আর্থিক সংকট, কখনো প্রিয়জন হারানোর বেদনা, আবার কখনো মানসিক অস্থিরতা বা অজানা ভয় মানুষকে বিপর্যস্ত করে তোলে। এমন কঠিন সময়ে একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হলো মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা। ইসলামে বিপদের সময় ধৈর্য ধারণের পাশাপাশি বেশি বেশি দোয়া করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোরআনে বর্ণিত হজরত ইউনুস (আ.)-এর একটি দোয়া এমনই একটি দোয়া, যা বিপদ থেকে মুক্তির অন্যতম শ্রেষ্ঠ দোয়া হিসেবে পরিচিত।

পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, হজরত ইউনুস (আ.) আল্লাহর নির্দেশের আগে নিজ এলাকা ত্যাগ করলে তিনি একসময় সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হন এবং একটি বিশাল মাছ তাঁকে গিলে ফেলে। মাছের পেটের অন্ধকার, সমুদ্রের গভীরতা এবং রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যে তিনি একমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করেন। আন্তরিক তাওবা ও বিনয়ের সঙ্গে তিনি যে দোয়া পাঠ করেছিলেন, আল্লাহ তাআলা তা কবুল করেন এবং তাঁকে সেই ভয়াবহ বিপদ থেকে মুক্তি দেন। এই ঘটনা কোরআনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা বিপদের সময় আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার এক অনন্য শিক্ষা।

হজরত ইউনুস (আ.)-এর সেই দোয়াটি হলো—

لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ

এর বাংলা উচ্চারণ—

লা ইলাহা ইল্লা আনতা, সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জালিমীন।

বাংলা অর্থ—

হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। আপনি সর্বপ্রকার ত্রুটি থেকে পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি নিজের প্রতি জুলুমকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।

ইসলামী চিন্তাবিদরা বলেন, এই দোয়ার প্রতিটি শব্দে রয়েছে তাওহিদের ঘোষণা, আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা এবং নিজের ভুল ও দুর্বলতার স্বীকারোক্তি। একজন বান্দা যখন নিজের অসহায়ত্ব স্বীকার করে একান্তভাবে আল্লাহর কাছে সাহায্য চান, তখন আল্লাহ তাআলার রহমত ও সাহায্যের দরজা খুলে যায়। এ কারণেই বিপদ, দুশ্চিন্তা ও কঠিন পরিস্থিতিতে এই দোয়া বেশি বেশি পড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

হাদিসেও এই দোয়ার বিশেষ ফজিলতের কথা উল্লেখ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, কোনো মুসলমান যদি আন্তরিকতার সঙ্গে হজরত ইউনুস (আ.)-এর এই দোয়া পড়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, তাহলে আল্লাহ তাআলা তার দোয়া কবুল করেন। তাই ব্যক্তিগত সংকট, পারিবারিক সমস্যা, মানসিক অশান্তি কিংবা অন্য যেকোনো বিপদের সময় এই দোয়াটি একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল।

আলেমরা বলেন, শুধু দোয়া পড়লেই হবে না; বরং দোয়ার সঙ্গে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা, ধৈর্য এবং হালাল পথে চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। ইসলামে দোয়া ও আমল—দুটিকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিপদের সময় নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত, ইস্তিগফার এবং আল্লাহর জিকির মানুষের অন্তরে প্রশান্তি এনে দেয় এবং কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলার শক্তি জোগায়।

পরিবারে ছোটদেরও এই দোয়া শেখানো উচিত বলে মত দেন ইসলামী শিক্ষাবিদরা। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই আল্লাহর ওপর ভরসা করতে শেখানো হলে তারা জীবনের প্রতিকূল সময়েও হতাশ না হয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে। বাবা-মা চাইলে প্রতিদিন নামাজের পর বা পারিবারিক দোয়ার সময় সন্তানদের নিয়ে এই দোয়া পড়তে পারেন।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, বর্তমান সময়ে মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। এমন সময়ে ইসলামের শিক্ষা মানুষকে শুধু মানসিক সান্ত্বনাই দেয় না, বরং আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস ও ধৈর্যের মাধ্যমে সংকট মোকাবিলার শক্তিও জোগায়। হজরত ইউনুস (আ.)-এর দোয়া সেই শিক্ষারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

ইসলামে বিপদকে শুধু শাস্তি হিসেবে দেখা হয় না; বরং অনেক সময় তা বান্দার ঈমানের পরীক্ষা এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সুযোগ। তাই কোনো বিপদে হতাশ না হয়ে বেশি বেশি তাওবা, ইস্তিগফার এবং দোয়া করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা কোরআনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি তাঁর বান্দাদের দোয়া শোনেন এবং উত্তম সময়ে তার জবাব দেন।

তাই জীবনের যেকোনো সংকট, দুশ্চিন্তা বা বিপদের মুহূর্তে এই দোয়াটি নিয়মিত পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। একই সঙ্গে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে সৎপথে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। একজন মুমিনের বিশ্বাস, সব ধরনের বিপদ থেকে মুক্তি দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলারই রয়েছে। তাঁর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে এবং তাঁর ওপরই পূর্ণ ভরসা রাখতে হবে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!