ইসলামে কোনো মুসলিমের মৃত্যু হলে তার জন্য দোয়া করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। জীবিতদের দোয়া আল্লাহ তাআলার দরবারে মৃত ব্যক্তির জন্য রহমত, ক্ষমা ও মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে শহীদ বা মৃত ব্যক্তির জন্য মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যে দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন, তা মুসলমানদের জন্য সর্বোত্তম অনুসরণীয় দোয়াগুলোর একটি।

হাদিসে বর্ণিত রয়েছে, সাহাবি আবু সালামা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জন্য বিশেষ একটি দোয়া করেন। এই দোয়ায় তিনি আল্লাহর কাছে মৃত ব্যক্তির গুনাহ মাফ, মর্যাদা বৃদ্ধি, পরিবার-পরিজনের হেফাজত এবং কবরকে প্রশস্ত ও আলোকিত করার আবেদন জানান। ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, এই দোয়াটি শুধু আবু সালামা (রা.)-এর জন্য নয়, বরং যেকোনো মুসলিম মৃত ব্যক্তির জন্যও পড়া যেতে পারে।

আরবি দোয়াটি হলো—

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِأَبِي سَلَمَةَ وَارْفَعْ دَرَجَتَهُ فِي الْمَهْدِيِّينَ وَاخْلُفْهُ فِي عَقِبِهِ فِي الْغَابِرِينَ وَاغْفِرْ لَنَا وَلَهُ يَا رَبَّ الْعَالَمِينَ وَافْسَحْ لَهُ فِي قَبْرِهِ وَنَوِّرْ لَهُ فِيهِ

উচ্চারণ:

আল্লাহুম্মাগফির লিআবি সালামাহ, ওয়ারফা’ দারাজাতাহু ফিল মাহদিয়্যীন। ওয়াখলুফহু ফি আকিবিহি ফিল গাবিরীন। ওয়াগফির লানা ওয়ালাহু ইয়া রব্বাল আলামীন। ওয়াফসাহ লাহু ফি কবরিহি ওয়া নাওয়ির লাহু ফীহি।

অর্থ:

হে আল্লাহ! আবু সালামাকে ক্ষমা করে দিন, হেদায়াতপ্রাপ্তদের মধ্যে তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করে দিন। তাঁর পরিবার-পরিজনের অভিভাবক হয়ে যান। হে বিশ্বজগতের প্রতিপালক! তাঁকে এবং আমাদের সবাইকে ক্ষমা করুন। তাঁর কবরকে প্রশস্ত করে দিন এবং তা নূরে আলোকিত করে দিন।

একই দোয়া যেকোনো মুসলিম মৃত ব্যক্তির জন্য পড়তে চাইলে ‘আবি সালামাহ’-এর পরিবর্তে ‘লাহু’ ব্যবহার করা যায়। তখন দোয়ার অর্থ হবে—

হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করুন, হেদায়াতপ্রাপ্তদের মধ্যে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করুন। তার পরিবার-পরিজনের দেখাশোনার দায়িত্ব আপনি গ্রহণ করুন। হে রাব্বুল আলামীন! তাকে এবং আমাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিন। তার কবরকে প্রশস্ত ও আলোকিত করে দিন।

ইসলামের ইতিহাসে আবু সালামা (রা.) ছিলেন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একজন সাহাবি। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল আসাদ। তিনি ছিলেন মহানবী (সা.)-এর ফুফাতো ভাই ও দুধভাই। এছাড়া তিনি উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা (রা.)-এর স্বামী ছিলেন।

ইসলামের শুরুর যুগেই তিনি ঈমান গ্রহণ করেন এবং মক্কার নির্যাতনের সময় স্ত্রীসহ হাবাশায় হিজরত করেন। পরে তিনি মদিনায় হিজরত করেন এবং ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। বদর যুদ্ধে তিনি বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেন। পরবর্তীতে ওহুদ যুদ্ধে গুরুতর আহত হন। সেই আঘাতের প্রভাবেই চতুর্থ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তাঁর মৃত্যুর পর রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে তাঁর বাড়িতে যান, তাঁর চোখ বন্ধ করে দেন এবং উপস্থিত সবার সামনে উল্লিখিত দোয়াটি করেন। এ ঘটনা থেকে মুসলমানদের জন্য বহু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়।

ইসলামী শিক্ষায় মৃত ব্যক্তির চোখ খোলা থাকলে তা বন্ধ করে দেওয়া সুন্নত। শোকের মুহূর্তে ধৈর্য ধারণ করা এবং কোনো ধরনের বদদোয়া থেকে বিরত থাকাও ইসলামের নির্দেশনা। হাদিসে আরও এসেছে, এমন সময় ফেরেশতারা উপস্থিত থাকেন এবং মুমিনের কল্যাণের দোয়ার সঙ্গে ‘আমিন’ বলেন। তাই মৃত ব্যক্তির জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা জীবিতদের জন্যও সওয়াব ও কল্যাণের কারণ।

আলেমরা বলেন, কোনো মুসলিমের ইন্তেকালের পর তার জন্য নিয়মিত মাগফিরাতের দোয়া করা, জানাজায় অংশ নেওয়া এবং তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আমল। বিশেষ করে পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং সব মুসলিম মৃতদের জন্য নিয়মিত দোয়া করা একজন মুমিনের উত্তম চরিত্রের পরিচয় বহন করে।

তাই প্রিয়জনের মৃত্যুতে শুধু শোক প্রকাশ নয়, বরং তাদের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা, আল্লাহর কাছে মাগফিরাত কামনা করা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়াগুলো পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। মহান আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের জীবিত ও মৃত সকল মুসলিমকে ক্ষমা করেন, তাদের কবরকে প্রশস্ত ও নূরানী করে দেন এবং জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করেন—এই দোয়াই হোক আমাদের সবার প্রার্থনা।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!