দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক লেনদেন আরও সহজ ও নিরাপদ করতে নতুন একটি সেবা চালু করেছে প্রাইম ব্যাংক পিএলসি। ব্যাংকটি দেশের প্রথম আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স সুবিধাসহ এসএমই ডেবিট কার্ড চালু করেছে, যার মাধ্যমে উদ্যোক্তারা বৈধ ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বিদেশে অনলাইন পেমেন্ট করতে পারবেন। একই সঙ্গে এই কার্ড ব্যবহার করে দেশের ভেতরেও এটিএম, পয়েন্ট অব সেল (POS) এবং ই-কমার্স লেনদেন সম্পন্ন করা যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নীতিগত নির্দেশনার আলোকে চালু হওয়া এই সেবা দেশের এসএমই খাতের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে যারা বিদেশি সফটওয়্যার, ক্লাউড সেবা, অনলাইন টুল, ডিজিটাল মার্কেটিং বা অন্যান্য ব্যবসায়িক সেবা গ্রহণের জন্য আন্তর্জাতিক পেমেন্ট করতে চান, তাদের জন্য এটি একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রাইম ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নতুন এসএমই ডেবিট কার্ডটি একক মালিকানাধীন (Proprietorship) ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য। অন্যদিকে পার্টনারশিপ বা লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলো একই ধরনের আন্তর্জাতিক সুবিধা পেতে এসএমই প্রিপেইড কার্ড গ্রহণ করতে পারবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা উপযোগী আর্থিক সমাধান নিশ্চিত করা হয়েছে।
নতুন কার্ডের অন্যতম বড় সুবিধা হলো আন্তর্জাতিক অনলাইন পেমেন্টের সুযোগ। তবে এই সুবিধা কেবল বৈধ ব্যবসায়িক ব্যয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, কার্ডটিতে একবারে সর্বোচ্চ ৬০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত রিফিল করা যাবে এবং একটি ক্যালেন্ডার বছরে মোট সর্বোচ্চ ৩,০০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ব্যয় করা যাবে। ফলে উদ্যোক্তারা বিদেশি ব্যবসায়িক সেবা গ্রহণে আরও সহজে অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন।
আন্তর্জাতিক সুবিধার পাশাপাশি এই এসএমই ডেবিট কার্ড দেশের অভ্যন্তরেও নিয়মিত ডেবিট কার্ডের মতো ব্যবহার করা যাবে। গ্রাহকরা এটিএম থেকে টাকা উত্তোলন, দোকানে POS মেশিনে পেমেন্ট এবং অনলাইন শপিংসহ বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল লেনদেন সম্পন্ন করতে পারবেন। ফলে একটি কার্ডেই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক—উভয় ধরনের ব্যবসায়িক লেনদেনের সুবিধা পাওয়া যাবে।
তবে এই কার্ড পাওয়ার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে। আবেদনকারীকে অবশ্যই এসএমই ফাউন্ডেশনে নিবন্ধিত হতে হবে। আবেদন পাওয়ার পর প্রাইম ব্যাংক সংশ্লিষ্ট তথ্য এসএমই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে যাচাই করবে। যাচাই সফল হলে গ্রাহকের নামে এসএমই ডেবিট কার্ড ইস্যু করা হবে। এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য হলো কেবল প্রকৃত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য আন্তর্জাতিক লেনদেনের সুবিধা নিশ্চিত করা।
প্রাইম ব্যাংক জানিয়েছে, বিদ্যমান এসএমই হিসাবধারীরাও এই সুবিধা নিতে পারবেন। তারা চাইলে তাদের বর্তমান ডেবিট কার্ড পরিবর্তন করে নতুন এসএমই ডেবিট কার্ড নিতে পারবেন। এছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন এসএমই প্রিপেইড কার্ডের জন্যও আবেদন করা যাবে। ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কার্ডটির বার্ষিক ফি ৬০০ টাকা (ভ্যাট প্রযোজ্য)।
প্রাইম ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করেন, আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স সুবিধাসহ এসএমই ডেবিট কার্ড দেশের উদ্যোক্তাদের বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করবে। বর্তমানে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে বিদেশি সফটওয়্যার সাবস্ক্রিপশন, ক্লাউড সার্ভিস, ডিজিটাল বিজ্ঞাপন, ডোমেইন, হোস্টিং কিংবা অন্যান্য ব্যবসায়িক সেবার জন্য আন্তর্জাতিক পেমেন্ট করতে হয়। নতুন কার্ডের মাধ্যমে এসব লেনদেন আরও সহজ, দ্রুত এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার আওতায় সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল ব্যবসার প্রসার এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে স্টার্টআপ, ই-কমার্স, আইটি সেবা, ফ্রিল্যান্সিং-সম্পর্কিত ব্যবসা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এই সুবিধা থেকে সরাসরি উপকৃত হতে পারেন। একই সঙ্গে বৈধ চ্যানেলে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক ব্যয় সম্পন্ন হওয়ায় আর্থিক স্বচ্ছতাও বাড়বে।
সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স সুবিধাসহ প্রাইম ব্যাংকের নতুন এসএমই ডেবিট কার্ড দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি যুগোপযোগী ব্যাংকিং সেবা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার আলোকে চালু হওয়া এই কার্ড উদ্যোক্তাদের বৈধ আন্তর্জাতিক লেনদেন সহজ করার পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যবসা সম্প্রসারণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।