বাংলাদেশে ব্যক্তিগত প্রয়োজন, ব্যবসা সম্প্রসারণ, কৃষিকাজ, বাড়ি নির্মাণ কিংবা জরুরি আর্থিক সংকট মোকাবিলার জন্য অনেকেই জমির দলিল বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে চান। জমির দলিলের বিপরীতে দেওয়া এই ঋণ সাধারণত মর্টগেজ লোন (Mortgage Loan) বা সিকিউরড লোন (Secured Loan) নামে পরিচিত। কারণ এখানে ঋণের নিরাপত্তা হিসেবে জমি বা স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রাখা হয়। তবে সব ধরনের জমির বিপরীতে সব ব্যাংক ঋণ দেয় না। জমির অবস্থান, মালিকানা, কাগজপত্র এবং আবেদনকারীর আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করার পরই ব্যাংক ঋণ অনুমোদন করে। এই প্রতিবেদনে জানুন কোন কোন ব্যাংক জমির দলিলের বিপরীতে ঋণ দেয়, কীভাবে আবেদন করবেন এবং কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে জমির দলিল বন্ধক রেখে ঋণ সুবিধা দিয়ে থাকে। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংক PLC, জনতা ব্যাংক PLC, অগ্রণী ব্যাংক PLC, রূপালী ব্যাংক PLC, পূবালী ব্যাংক PLC, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ PLC, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক PLC, ব্র্যাক ব্যাংক PLC, সিটি ব্যাংক PLC, ব্যাংক এশিয়া PLC, ইস্টার্ন ব্যাংক PLC (EBL), প্রাইম ব্যাংক PLC, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (UCB)-সহ আরও অনেক ব্যাংক বিভিন্ন ধরনের মর্টগেজভিত্তিক ঋণ প্রদান করে। তবে প্রতিটি ব্যাংকের ঋণের ধরন, সুদের হার, যোগ্যতা ও শর্ত আলাদা হতে পারে।
জমির দলিলের বিপরীতে ঋণ পেতে হলে প্রথমেই আবেদনকারীর জমির মালিকানা বৈধ হতে হবে। জমির মূল দলিল, নামজারি (Mutation), খতিয়ান, পর্চা, হালনাগাদ খাজনা পরিশোধের রসিদ এবং প্রয়োজনে জমির নকশাসহ বিভিন্ন কাগজপত্র ব্যাংকে জমা দিতে হয়। ব্যাংক সাধারণত নিজস্ব আইনজীবীর মাধ্যমে জমির আইনি অবস্থা (Legal Verification) যাচাই করে এবং প্রয়োজনে মূল্যায়নকারী (Valuer) দিয়ে জমির বাজারমূল্য নির্ধারণ করে।
শুধু জমির দলিল থাকলেই ঋণ পাওয়া যায় না। আবেদনকারীর নিয়মিত আয়ের উৎসও থাকতে হবে। চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে বেতন সনদ, ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স, আয়ের বিবরণী, ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং প্রয়োজনে TIN বা আয়কর-সংক্রান্ত নথি জমা দিতে হতে পারে। ব্যাংক আবেদনকারীর ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নেয় কত টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হবে।
ঋণের পরিমাণ নির্ধারণে জমির বাজারমূল্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাধারণত ব্যাংক জমির সম্পূর্ণ মূল্য অনুযায়ী ঋণ দেয় না। মূল্যায়নের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট একটি অংশ পর্যন্ত ঋণ অনুমোদন করা হয়। এই অনুপাত ব্যাংকভেদে ভিন্ন হতে পারে। একইভাবে ঋণের মেয়াদ, কিস্তির সংখ্যা এবং সুদের হারও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নীতিমালার ওপর নির্ভর করে।
অনেকেই মনে করেন, কৃষিজমি, বাণিজ্যিক জমি এবং আবাসিক জমির ক্ষেত্রে একই নিয়মে ঋণ দেওয়া হয়। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। জমির ধরন, অবস্থান, ব্যবহার এবং আইনি অবস্থা বিবেচনা করে ব্যাংক সিদ্ধান্ত নেয় ঋণ দেওয়া হবে কি না। কোনো কোনো ব্যাংক নির্দিষ্ট এলাকার জমি বা নির্দিষ্ট ধরনের সম্পত্তির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করতে পারে।
বর্তমানে অনেক ব্যাংক তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ঋণের প্রাথমিক তথ্য এবং অনলাইন আবেদন সুবিধা প্রদান করছে। আবেদনকারী প্রথমে অনলাইনে আবেদন করে প্রাথমিক তথ্য জমা দিতে পারেন। এরপর ব্যাংকের প্রতিনিধি যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা নেওয়া, সম্পত্তি যাচাই এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। তবে চূড়ান্ত ঋণ অনুমোদনের আগে জমির আইনি যাচাই ও মর্টগেজ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক।
ঋণ গ্রহণের আগে সুদের হার, প্রসেসিং ফি, স্ট্যাম্প চার্জ, আইনগত যাচাইয়ের খরচ, সম্পত্তি মূল্যায়নের খরচ এবং আগাম ঋণ পরিশোধের চার্জ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া উচিত। অনেক সময় কম সুদের বিজ্ঞাপন দেখালেও অন্যান্য চার্জের কারণে মোট ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। তাই ঋণ চুক্তিপত্র ভালোভাবে পড়ে বুঝে তারপর স্বাক্ষর করা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জমির দলিল বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়ার আগে জমির সব কাগজপত্র হালনাগাদ করা জরুরি। নামজারি সম্পন্ন না থাকলে, মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে বা খাজনা বকেয়া থাকলে ঋণ অনুমোদনে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এছাড়া মাসিক কিস্তি (EMI) নিজের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও আগে থেকে হিসাব করে নেওয়া উচিত।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “জমির দলিল দিলেই তাৎক্ষণিক লোন”, “কোনো যাচাই ছাড়াই ঋণ” বা “একদিনেই কোটি টাকার লোন”—এ ধরনের অনেক বিজ্ঞাপন দেখা যায়। এসব দাবির অনেকগুলোই বিভ্রান্তিকর বা প্রতারণামূলক হতে পারে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ব্যাংক বা বৈধ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই ঋণের জন্য আবেদন করা নিরাপদ। কোনো অবস্থাতেই অচেনা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে দলিলের মূল কপি বা ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া উচিত নয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি অনেক ব্যাংক জমির দলিল বন্ধক রেখে ঋণ সুবিধা প্রদান করে। তবে ঋণ পাওয়ার জন্য বৈধ জমির কাগজপত্র, নিয়মিত আয়ের প্রমাণ, ভালো আর্থিক সক্ষমতা এবং ব্যাংকের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করা জরুরি। আবেদন করার আগে একাধিক ব্যাংকের ঋণের শর্ত, সুদের হার এবং অন্যান্য চার্জ তুলনা করলে নিজের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ঋণ নির্বাচন করা সহজ হবে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!