বাংলাদেশে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এখন শুধু ভোটাধিকার প্রয়োগের একটি পরিচয়পত্র নয়; এটি নাগরিকের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সেবার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ব্যাংক হিসাব খোলা, মোবাইল সিম নিবন্ধন, পাসপোর্ট আবেদন, জমি নিবন্ধন, সরকারি ভাতা, চাকরির আবেদন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র অপরিহার্য।
কিন্তু নানা কারণে অনেকের এনআইডি কার্ড হারিয়ে যায়, নষ্ট হয়ে যায় অথবা নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা কিংবা অন্যান্য তথ্য সংশোধনের প্রয়োজন হয়। এসব সেবা গ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত ফি পরিশোধ করতে হয়। একই সঙ্গে আবেদনকারীদের নির্ধারিত নিয়ম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও অনুসরণ করতে হয়।
নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, এনআইডি হারানো, পুনরায় ইস্যু, তথ্য সংশোধন ও নবায়নের জন্য নির্ধারিত ফি কার্যকর রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অনলাইন সেবার সম্প্রসারণের ফলে এখন আগের তুলনায় আবেদন প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়েছে এবং অধিকাংশ আবেদনকারী ঘরে বসেই প্রাথমিক আবেদন সম্পন্ন করতে পারছেন।
জাতীয় পরিচয়পত্রে তথ্যগত ভুল থাকলে তা যত দ্রুত সম্ভব সংশোধন করার পরামর্শ দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। কারণ এনআইডির তথ্যের সঙ্গে জন্ম নিবন্ধন, পাসপোর্ট, ব্যাংক হিসাব কিংবা অন্যান্য সরকারি নথির তথ্যের অমিল থাকলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনগত জটিলতার মুখোমুখি হতে হতে পারে।
বর্তমান নির্ধারিত ফি অনুযায়ী, জাতীয় পরিচয়পত্র হারিয়ে বা নষ্ট হয়ে গেলে প্রথমবার নতুন কার্ড পেতে সাধারণ সেবায় ২০০ টাকা এবং জরুরি সেবায় ৩০০ টাকা ফি দিতে হবে। দ্বিতীয়বার হারালে সাধারণ সেবায় ৩০০ টাকা ও জরুরি সেবায় ৫০০ টাকা এবং তৃতীয়বার বা তার পরবর্তী সময়ে হারালে সাধারণ সেবায় ৫০০ টাকা ও জরুরি সেবায় ১ হাজার টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, জাতীয় পরিচয়পত্রে তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত ফি রয়েছে। প্রথমবার তথ্য সংশোধনের জন্য ২০০ টাকা, দ্বিতীয়বার ৩০০ টাকা এবং তৃতীয়বার বা পরবর্তী সংশোধনের জন্য ৪০০ টাকা ফি দিতে হবে। এছাড়া সার্ভারে সংরক্ষিত তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রেও পৃথক ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।
এনআইডি কার্ড নবায়নের ক্ষেত্রেও ফি নির্ধারণ করেছে নির্বাচন কমিশন। সাধারণ নবায়নের জন্য ১০০ টাকা এবং জরুরি নবায়নের জন্য ১৫০ টাকা পরিশোধ করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত মেয়াদ শেষে জাতীয় পরিচয়পত্র নবায়ন করা বাধ্যতামূলক।
আবেদনকারীরা এখন নির্বাচন কমিশনের অনলাইন এনআইডি সেবা পোর্টালে নিবন্ধন করে বিভিন্ন ধরনের আবেদন করতে পারেন। অনলাইনে আবেদন সম্পন্ন করার পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোড এবং নির্ধারিত ফি পরিশোধ করলে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিস আবেদন যাচাই করে পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করে। এছাড়া দেশের উপজেলা ও থানা নির্বাচন অফিস থেকেও সরাসরি আবেদন করা যায়।
তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের অবশ্যই যথাযথ প্রমাণপত্র জমা দিতে হবে। সংশোধনের ধরন অনুযায়ী জন্ম নিবন্ধন সনদ, এসএসসি বা সমমানের সনদ, পাসপোর্ট, নাগরিকত্ব সনদ, বিবাহ নিবন্ধন সনদ অথবা আদালতের আদেশসহ অন্যান্য বৈধ নথি প্রয়োজন হতে পারে। পর্যাপ্ত প্রমাণপত্র না থাকলে আবেদন বাতিল বা অতিরিক্ত যাচাইয়ের জন্য সময় লাগতে পারে।
এর আগে জাতীয় পরিচয়পত্র হারিয়ে গেলে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে হতো। তবে নাগরিকদের ভোগান্তি কমাতে নির্বাচন কমিশন সেই বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়েছে। ফলে এখন হারানো এনআইডির জন্য আবেদন করতে জিডি সংযুক্ত করা বাধ্যতামূলক নয়। তবে কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত তথ্য বা ব্যাখ্যা চাইতে পারে।
ফি পরিশোধের ক্ষেত্রেও আগের তুলনায় বেশ কিছু সুবিধা যুক্ত হয়েছে। আবেদনকারীরা ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, বিকাশসহ অনুমোদিত ব্যাংকিং ও অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্ধারিত ফি জমা দিতে পারেন। ফি জমা দেওয়ার পর রসিদ সংরক্ষণ করা জরুরি, কারণ আবেদন যাচাইয়ের সময় সেটি প্রয়োজন হতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এনআইডি সংশোধনের জন্য কোনো দালাল বা তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি সরকারি পোর্টাল বা নির্বাচন অফিসের মাধ্যমে আবেদন করাই নিরাপদ। এতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় যেমন এড়ানো যায়, তেমনি প্রতারণার ঝুঁকিও কমে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সব সরকারি নথির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি তথ্যগত ভুল ভবিষ্যতে পাসপোর্ট, ব্যাংকিং, চাকরি কিংবা সম্পত্তি সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই কার্ড হারানো, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বা তথ্যগত কোনো অসঙ্গতি দেখা দিলে দ্রুত নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত নিয়মে আবেদন করাই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!