বাংলাদেশে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বর্তমানে নাগরিক পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথিগুলোর একটি। ব্যাংক হিসাব খোলা, পাসপোর্ট আবেদন, চাকরিতে যোগদান, মোবাইল সিম নিবন্ধন, জমি রেজিস্ট্রেশন, সরকারি ভাতা গ্রহণসহ অসংখ্য সেবায় জাতীয় পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক। তাই এনআইডিতে থাকা ছবি যদি অস্পষ্ট, ঝাপসা, অনেক পুরোনো বা ব্যক্তির বর্তমান চেহারার সঙ্গে মিল না থাকে, তাহলে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে।
অনেকেই মনে করেন, জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি ঘরে বসেই অনলাইনে পরিবর্তন করা যায়। তবে বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। নির্বাচন কমিশনের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, এনআইডির ছবি সরাসরি অনলাইনে আপলোড বা পরিবর্তনের সুযোগ নেই। কারণ ছবি, আঙুলের ছাপ, আইরিশ ও স্বাক্ষর জাতীয় পরিচয়পত্রের বায়োমেট্রিক তথ্যের অংশ। নিরাপত্তার কারণে এসব তথ্য কেবল নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হালনাগাদ করা হয়।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, অনেকেই বিভিন্ন ওয়েবসাইট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভুল তথ্য দেখে বিভ্রান্ত হন। বাস্তবে এনআইডি অনলাইন সেবায় নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর বা অন্যান্য তথ্য সংশোধনের আবেদন করা গেলেও শুধুমাত্র নিজের মোবাইল বা কম্পিউটার থেকে নতুন ছবি আপলোড করার কোনো সুবিধা নেই। নতুন ছবি তুলতে হলে আবেদনকারীকে নিজেই নির্বাচন অফিসে উপস্থিত হতে হয়।
ছবি পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে প্রথমে নির্বাচন কমিশনের এনআইডি অনলাইন অ্যাকাউন্টে লগইন করে তথ্য সংশোধনের আবেদন করতে হবে অথবা সরাসরি উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করতে হবে। আবেদন গ্রহণের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে আবেদনকারীকে বায়োমেট্রিক তথ্য হালনাগাদের জন্য অফিসে উপস্থিত হতে নির্দেশনা দেয়। সেখানেই নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব ক্যামেরায় নতুন ছবি তোলা হয় এবং প্রয়োজনে স্বাক্ষর বা অন্যান্য বায়োমেট্রিক তথ্যও পুনরায় নেওয়া হয়।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আবেদনকারী নিজে থেকে কোনো স্টুডিওতে তোলা ছবি বা মোবাইলে ধারণ করা ছবি জমা দিয়ে এনআইডির ছবি পরিবর্তন করতে পারবেন না। কারণ জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি একটি নিরাপত্তাসংক্রান্ত বায়োমেট্রিক তথ্য হিসেবে সংরক্ষিত থাকে। এজন্য অফিসিয়াল ক্যামেরায় সরাসরি ছবি ধারণ করা বাধ্যতামূলক।
ছবি পরিবর্তনের আবেদন করার সময় কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে রাখা ভালো। সাধারণত জাতীয় পরিচয়পত্রের মূল কপি বা নম্বর, প্রয়োজনীয় আবেদনপত্র এবং ছবি পরিবর্তনের যৌক্তিক কারণ জানাতে হয়। প্রয়োজনে জন্ম নিবন্ধন সনদ, এসএসসি বা সমমানের সনদ, পাসপোর্ট, নাগরিকত্ব সনদ কিংবা অন্যান্য সহায়ক নথিও চাওয়া হতে পারে। আবেদনকারীর তথ্যের ধরন অনুযায়ী অতিরিক্ত কাগজপত্রের প্রয়োজন হতে পারে।
অনেকেই জানতে চান, শুধু ছবি পরিবর্তনের জন্য নতুন করে ভোটার হতে হবে কি না। এর উত্তর হলো—না। আপনি যদি ইতোমধ্যে এনআইডিধারী হন, তাহলে নতুন ভোটার হওয়ার প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র সংশোধন বা বায়োমেট্রিক হালনাগাদের আবেদন করলেই নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নতুন ছবি সংযুক্ত করা সম্ভব।
ছবি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সরকারি ফিও পরিশোধ করতে হয়। আবেদনটি কোন ধরনের সংশোধনের আওতায় পড়ছে এবং কতবার সংশোধনের আবেদন করা হচ্ছে, তার ওপর ফি নির্ভর করতে পারে। নির্ধারিত ফি অনলাইনে, মোবাইল ব্যাংকিং অথবা নির্বাচন কমিশন অনুমোদিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিশোধ করা যায়। আবেদন জমা দেওয়ার পর অবশ্যই পেমেন্ট রসিদ সংরক্ষণ করতে হবে।
আবেদন অনুমোদনের সময়ও একেক ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে। সাধারণত আবেদন, কাগজপত্র যাচাই, বায়োমেট্রিক তথ্য গ্রহণ এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সংশোধিত তথ্য জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেজে যুক্ত করা হয়। আবেদন সম্পন্ন হলে অনলাইন অ্যাকাউন্টে হালনাগাদ তথ্য দেখা যায় এবং পরবর্তীতে সংশোধিত এনআইডি সংগ্রহ বা ডাউনলোড করা যায়।
এনআইডির ছবি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি যে ভুলটি অনেক নাগরিক করেন, তা হলো দালাল বা অননুমোদিত ব্যক্তির ওপর নির্ভর করা। নির্বাচন কমিশন বারবার সতর্ক করে বলছে, এ ধরনের কাজের জন্য কোনো মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন নেই। আবেদনকারী নিজেই অনলাইনে আবেদন করতে পারেন অথবা সরাসরি উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে গিয়ে সরকারি নিয়মে আবেদন জমা দিতে পারেন। এতে প্রতারণার ঝুঁকি যেমন কমে, তেমনি অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত অর্থও ব্যয় করতে হয় না।
এছাড়া আবেদন করার আগে নিজের মোবাইল নম্বর সক্রিয় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আবেদন যাচাই বা পরবর্তী নির্দেশনা অনেক ক্ষেত্রে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরের মাধ্যমেই জানানো হয়। একই সঙ্গে আবেদন ফরমে দেওয়া তথ্য যেন জন্ম নিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদ, পাসপোর্টসহ অন্যান্য সরকারি নথির সঙ্গে মিল থাকে, সেদিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। তথ্যের অসামঞ্জস্য থাকলে আবেদন নিষ্পত্তিতে অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে মুখের অবয়ব অনেকটাই পরিবর্তিত হয়ে গেলে কিংবা এনআইডির ছবির কারণে ব্যাংক, পাসপোর্ট বা অন্যান্য সরকারি সেবা গ্রহণে সমস্যা হলে দেরি না করে ছবি হালনাগাদের আবেদন করা উচিত। এতে ভবিষ্যতে পরিচয় যাচাইয়ের সময় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা এড়ানো সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে, জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি পরিবর্তনের জন্য এখনো অনলাইনে সরাসরি ছবি আপলোড করার সুযোগ চালু হয়নি। নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করে নির্বাচন কমিশনের অফিসে উপস্থিত হয়ে নতুন ছবি তুলতে হবে। সঠিক কাগজপত্র, নির্ধারিত ফি এবং সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে ছবি পরিবর্তনের কাজ তুলনামূলক সহজেই সম্পন্ন করা সম্ভব।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!