জুমার দিন মুসলমানদের জন্য সপ্তাহের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ দিন। এই দিনে জুমার নামাজ আদায় করা প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ ও মুকিম মুসলিম পুরুষদের ওপর ফরজ। তবে জুমার নামাজ শুধু দুই রাকাত ফরজ নামাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর আগে ইমাম যে দুইটি খুতবা প্রদান করেন, সেটিও জুমার গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য অংশ। ইসলামী শরিয়তে খুতবা মনোযোগ দিয়ে শুনা ওয়াজিব এবং খুতবার সময় অপ্রয়োজনীয় কথা বলা বা অন্য কাজে ব্যস্ত হওয়া থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
বর্তমান সময়ে অনেক মুসল্লি আরবি ভাষা না বোঝার কারণে জুমার খুতবার গুরুত্ব, প্রথম ও দ্বিতীয় খুতবার পার্থক্য এবং এতে কী বলা হয়—এসব বিষয়ে জানতে আগ্রহী হন। ইসলামী বিশেষজ্ঞরা বলেন, খুতবার প্রতিটি অংশের অর্থ বোঝা মুসল্লিদের ইমানি সচেতনতা বাড়াতে সহায়তা করে। জুমার খুতবা হলো ইমামের পক্ষ থেকে জুমার নামাজের আগে প্রদত্ত ধর্মীয় ভাষণ, যা দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম খুতবায় সাধারণত আল্লাহর প্রশংসা, দরুদ, তাকওয়া, ঈমান, নসিহত ও কোরআনের আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। দ্বিতীয় খুতবায় মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া, ক্ষমা প্রার্থনা এবং কল্যাণ কামনা করা হয়। ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী, খুতবা জুমার নামাজের শর্তসমূহের অন্তর্ভুক্ত। তাই খুতবা ছাড়া জুমা সম্পূর্ণ হয় না।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জুমার খুতবা মনোযোগ দিয়ে শুনার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। সহিহ বুখারির হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে মসজিদে আসে, মনোযোগ দিয়ে খুতবা শুনে এবং অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে বিরত থাকে, তার এক জুমা থেকে আরেক জুমা পর্যন্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। আলেমরা বলেন, এ হাদিস থেকে বোঝা যায় যে খুতবা শুধু শুনলেই হবে না; বরং নীরবতা, মনোযোগ ও আদব বজায় রাখাও জরুরি।
প্রথম খুতবা সাধারণত তুলনামূলক দীর্ঘ হয়। এতে ইমাম আল্লাহর প্রশংসা ও ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে খুতবা শুরু করেন। এরপর তাকওয়া অবলম্বন, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, কোরআনের শিক্ষা, রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ, পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব এবং আখিরাতের প্রস্তুতি সম্পর্কে নসিহত করেন। প্রথম খুতবার শুরুতে বহুল পঠিত আরবি অংশ হলো:
إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ…
এর মাধ্যমে আল্লাহর প্রশংসা, সাহায্য ও ক্ষমা প্রার্থনা করা হয় এবং সাক্ষ্য দেওয়া হয় যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বান্দা ও রাসুল।
দ্বিতীয় খুতবা সাধারণত সংক্ষিপ্ত হয়। এতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় দরুদ শরিফ, মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া, মাগফিরাত, রহমত, নিরাপত্তা, রিজিক ও কল্যাণ কামনার ওপর। অনেক ইমাম এ সময় দেশের শান্তি, মুসলমানদের ঐক্য এবং মানবতার কল্যাণের জন্যও দোয়া করেন। দ্বিতীয় খুতবায় সাধারণত দরুদে ইবরাহিমি পাঠ করা হয়:
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ…
এর মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর পরিবারবর্গের ওপর রহমত ও বরকত কামনা করা হয়।
ইসলামী আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রথম খুতবা মূলত শিক্ষা, নসিহত ও কোরআনের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য; আর দ্বিতীয় খুতবা দোয়া ও সমাপ্তির জন্য। প্রথম খুতবা তুলনামূলক দীর্ঘ, দ্বিতীয়টি সংক্ষিপ্ত। উভয় খুতবাই সুন্নাহ অনুযায়ী আরবিতে হওয়া উত্তম, তবে মুসল্লিদের বোঝার জন্য স্থানীয় ভাষায় ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে।
খুতবা শুরু হলে মুসল্লিদের সম্পূর্ণ নীরব থাকতে হবে। কারও সঙ্গে কথা বলা, মোবাইল ফোন ব্যবহার করা, অনর্থক ইশারা করা বা অন্য কাজে ব্যস্ত হওয়া অনুচিত। এমনকি কাউকে “চুপ থাকুন” বলাও অনেক আলেমের মতে খুতবার আদবের পরিপন্থী। খুতবার সময় নফল বা সুন্নত নামাজ শুরু না করাই উত্তম। ইমাম যখন দোয়া করেন, তখন মনে মনে আমিন বলা যায়।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, জুমার দিনে এমন একটি বিশেষ সময় রয়েছে যখন বান্দার দোয়া কবুল হয়। এ সময়টি নিয়ে আলেমদের বিভিন্ন মত রয়েছে। কেউ বলেন খুতবার সময়, কেউ বলেন আসরের পর সূর্যাস্তের পূর্ব মুহূর্ত। তাই জুমার পুরো দিনই বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফারে কাটানো উত্তম।
অনেকে মনে করেন খুতবা না শুনলেও শুধু দুই রাকাত ফরজ পড়লেই জুমা আদায় হয়ে যাবে। আবার কেউ খুতবার সময় মোবাইল দেখা বা আলাপ করাকে তুচ্ছ বিষয় মনে করেন। ইসলামী বিশেষজ্ঞরা বলেন, এসব আচরণ জুমার আদব ও সওয়াবের পরিপন্থী। যদিও অধিকাংশ ফকিহের মতে নামাজ শুদ্ধ হয়ে যায়, তবে সওয়াব মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে।
মূল খুতবা আরবিতে দেওয়া সুন্নাহসম্মত। তবে মুসল্লিদের বোঝার সুবিধার্থে আরবির আগে বা পরে বাংলায় সংক্ষিপ্ত আলোচনা বা ব্যাখ্যা করা অনেক আলেম বৈধ বলেছেন। তবে ফরজ খুতবার মৌলিক অংশ আরবিতেই হওয়া উচিত বলে অধিকাংশ ফকিহ মত দিয়েছেন।
জুমার প্রথম ও দ্বিতীয় খুতবা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও শিক্ষা ব্যবস্থার অংশ। প্রথম খুতবা মুসলমানদের ঈমান, তাকওয়া ও জীবন পরিচালনার দিকনির্দেশনা দেয়, আর দ্বিতীয় খুতবা দোয়া ও রহমতের আবেদন নিয়ে সমাপ্ত হয়। একজন মুমিনের উচিত সময়মতো মসজিদে উপস্থিত হওয়া, মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা, নীরবতা বজায় রাখা এবং খুতবার শিক্ষা নিজের জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা। কারণ জুমার খুতবা শুধু একটি বক্তৃতা নয়; এটি আল্লাহর স্মরণ, আত্মশুদ্ধি ও সমাজ সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!